সংখ্যার প্রতি আমাদের একটি স্বাভাবিক দুর্বলতা আছে। কোনো বিষয় সংখ্যা দিয়ে প্রতিফলিত হলেই আমরা মনে করি যে এটাই মোক্ষম, এটাই সত্য। কিন্তু সংখ্যা যে একটি আঙ্কিক বিষয় এবং সংখ্যার বিমূর্ততার পেছনে নানা গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো, ধারণা ও মূল্যবোধ প্রচ্ছন্ন থাকে, তা আমরা প্রায়ই বিস্মৃত হই এবং প্রায়ই ঘটে বাজেট–বিশ্লেষণ ও আলোচনায়। এ বছরের বাজেট–বিতর্কেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ সালের বাজেটের আলোচনা ও বিশ্লেষণে নানা সংখ্যা, বহু তথ্য-উপাত্ত উত্থাপিত হয়েছে, বাজেটের বিভিন্ন আঙ্কিক বিষয়ে নানান তর্কবিতর্ক হয়েছে। যেহেতু একটি দেশের বাজেট সে দেশের বার্ষিক অর্থনৈতিক হিসাবপত্র, তাই বাজেটে সংখ্যা-উপাত্ত, টাকার হিসাব থাকবেই। সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে, কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে সব সংখ্যা, উপাত্ত, আয়-ব্যয়, উদ্বৃত্ত-ঘাটতি, অর্থ বরাদ্দের পর যে মৌলিক প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক, সেটা হচ্ছে, এর ফলে মানুষের যাপিত জীবনে কতটা স্বস্তি আসবে, তার জীবনের মান কতটুকু উন্নীত হবে? মানুষের জন্য বাজেট হওয়া চাই—বাংলাদেশের বাজেটকেও তাই সংখ্যার সীমানা পেরিয়ে যেতে হবে।
সে প্রসঙ্গে যে কথা গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে সংখ্যা-উপাত্ত, আঙ্কিক কাঠামো পেরিয়ে সব বাজেটের একটি উন্নয়নদর্শন থাকা প্রয়োজন। একটি বাজেট কি বিশ্বাস করে যে একটি দেশের বস্তুগত উন্নয়নই সবকিছু, নাকি তার দর্শন হচ্ছে, উন্নয়নের শেষ কথা হচ্ছে মানব–উন্নয়ন? ২০২৬-২৭ সালের বাজেটের শিরোনাম ছিল ‘একটি মানবতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন’। এই শিরোনাম থেকে বর্তমান বাজেটের তিনটি বৈশিষ্ট্য বেরিয়ে আসে। এক. মানববাদী একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রমুখী হবে এ বাজেট। দুই. মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই এ বাজেটের দর্শন। তিন. উপর্যুক্ত উন্নয়নে সবার অংশগ্রহণ থাকবে এবং উন্নয়নের সুফলও সমভাবে বণ্টিত হবে।
দ্বিতীয়ত, উপর্যুক্ত উন্নয়নদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বাজেটের লক্ষ্যগুলো নির্ধারিত হয়েছে, কৌশলগুলো চিহ্নিত হয়েছে, অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দু–দুটি বিষয় বেশ জরুরি।
এক. প্রথমেই একটি নিরীক্ষণ ও মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে যে এ বিষয়গুলো বাজেটের উন্নয়নদর্শনের সঙ্গে কতখানি সংগতিপূর্ণ? তা না হলে প্রয়োজনীয় দিক পরিবর্তনের কথা শুরুতেই ভাবতে হবে। দুই. এটাও মূল্যায়িত হওয়া দরকার যে বাজেটের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলো কতখানি বাস্তবসম্মত? যেমন ২০২৬-২৭ সালের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, যা বর্তমান অর্জিত প্রবৃদ্ধি হারের দ্বিগুণ।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক শ্লথতার পরিপ্রেক্ষিতে এটা কতটা বাস্তবসম্মত? অন্যদিকে বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো কি বর্তমান বাস্তবতায় অর্জনযোগ্য? এর অন্য দিকটা হচ্ছে, এমন সব লক্ষ্যমাত্রা যে জনপ্রত্যাশা ইতিমধ্যেই উচ্চ, তাকে আরও উসকে দেবে। সেই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে সরকারের প্রতি জন–আস্থা বিঘ্নিত হবে, যা বর্তমান নবীন সরকারের বিশ্বাসযোগত্যাকে ক্ষুণ্ন করবে।
তৃতীয়ত, বর্তমান বাজেটকে কঠিন একটি ভারসাম্য প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছে। একদিকে বাজেটকে সাশ্রয়ী হতে হয়েছে, অন্যদিকে এটিকে উচ্চাভিলাষী হতে হয়েছে। কারণ, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে বাজেটকে রক্ষণশীল হতে হয়েছে, কিন্তু অন্যদিকে অর্থনৈতিক শ্লথতা উতরানোর জন্য বাজেটে নানা খাতে প্রণোদনা জোগাতে হয়েছে। সুতরাং বাজেটকে একদিকে জনস্বস্তি নিশ্চিত করতে হয়েছে, অন্যদিকে এটিকে প্রণোদনামূলক হতে হয়েছে। সেই সঙ্গে বাজেটটিকে আগামীতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তরায়ের সম্মুখীন হতে হবে—বাস্তবায়নের সনাতন ও নবতর সমস্যা, অর্থায়নের প্রতিবন্ধকতা ও বহমান বৈশ্বিক সংকট।
বাজেট বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবেবাজেট প্রণয়নের চেয়েও বড় সমস্যা হচ্ছে বাজেটের বাস্তবায়ন। নানান অন্তরায়ের কারণে প্রকল্পগুলো শুরু করতেই দেরি হয়ে যায়। আমাদের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে যাওয়ায় বাজেট বাস্তবায়নে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
বর্তমান বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ বেশ বেশি। সে প্রসঙ্গে প্রশ্ন হচ্ছে, অর্থ কোথা থেকে আসবে? আমাদের রাজস্ব আহরণের ভিত্তি ও কাঠামো বেশ দুর্বল। সে অবস্থায় সরকারকে দেশি ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকার বড় পরিমাণের ঋণ গ্রহণ করলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি কমে যাবে। তার চেয়েও বড় কথা, আমাদের বৈদেশিক ঋণ ও ঋণ পরিশোধের ভার অত্যন্ত বেশি।
সে অবস্থায় আন্তর্জাতিক উৎস থেকে নতুন ঋণ পাওয়া দুষ্কর হবে এবং এটাও মনে রাখা দরকার, আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বেড়ে গেছে এবং ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক অঙ্গনে ভূরাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক সংকট বেড়ে যাওয়ায় এবং সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রসারের ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নবতর সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে।
প্রথম বাজেটে গণিতের চেয়ে নিশানা বেশি গুরুত্বপূর্ণউপরিউক্ত সমস্যগুলোর কোনোটাই একটা অন্যটা থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটকে তার পাঁচ বছরের বৃহত্তর পরিকল্পনা, যা কিনা ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে, তার নিরিখে দেখতে হবে। আগামী পাঁচ বছরের প্রতিটি বাজেট সেই মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার একেকটি ধাপ। আমরা প্রত্যাশা করি, প্রতিবছরের বাজেটই সেই পাঁচ বছরের পরিকল্পনা লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য ধাপে ধাপে এগিয়ে যাবে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা বর্তমান অর্থবছর শেষে মূল্যায়ন করব যে সরকারের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে এ বছরের বাজেটের কাছে যা প্রত্যাশিত ছিল, তা অর্জিত হয়েছে কি না।
এ মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশকে ত্রিমুখী সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে—চলমান সমস্যা, ঘনীভূত সমস্যা এবং আবির্ভূমান সমস্যা। দারিদ্র্য ও বঞ্চনা, অর্থনৈতিক শ্লথতা, মূল্যস্ফীতি, কর্মহীনতা ইত্যাদি সমস্যা বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্য চলমান সংকট হয়ে চলতে থাকবে। ঘনীভূত সমস্যার মধ্যে থাকবে অসমতা ও বৈষম্য, নারীর প্রতি সহিংসতা, আর্থিক খাতের সংকট, পরিবেশদূষণ ইত্যদি। বৈশ্বিক সংকটের নানা মাত্রিকতা, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতি, ভূ-অর্থনৈতিক নানা অন্তরায়, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশ অর্থনীতির আবির্ভূমান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এসবই বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যাঘাত ঘটাবে।
বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে, শিক্ষার উন্নয়ন হবে তোএর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে নানা সংস্কারকে—রাজনৈতিক, আর্থিক ও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কারকে। এর কোনো বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, নতুন নতুন সম্ভাবনার সুযোগ নিতে হবে। অর্থনীতির বৈচিত্র্যকরণ অতি জরুরি। সৃজনশীল অর্থনীতি, সুনীল অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতির সুযোগ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো জরুরি।
বর্তমান বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তার জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। কিন্তু এসব সুযোগ গ্রহণ করতে হলে বাংলাদেশকে তার মানবসম্পদকে গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, সংস্কার এবং প্রদত্ত সেবার গুণগত মানের উন্নতি। তৃতীয়ত, বাংলাদেশকে একটি কল্যাণকামী এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে রাজনৈতিক গণতন্ত্রই যথেষ্ট নয়, সেখানে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রকে নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ণ তাই অপরিহার্য। সংখ্যার সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সেই জায়গায় পৌঁছাতে হবে।
সেলিম জাহান জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক
মতামত লেখকের নিজস্ব





