বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) ব্যবহার সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের অভাব।
‘বাংলাদেশে ইভি ব্যবহার: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনারে এমন মন্তব্য করেছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ।
শনিবার (২৭ জুন) ডিসিসিআই এবং বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউঅ্যাবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ) যৌথভাবে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে এ সেমিনারের আয়োজন করে। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষণা কাউন্সিলের (বিইপিআরসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্যে পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, যেখানে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তিচালিত যানবাহনের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার এ শিল্পের বিকাশে কর ও শুল্ক সুবিধাসহ বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নিলেও চার্জিং অবকাঠামো উন্নয়ন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড নির্ধারণ ও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তাসকীন আহমেদ বলেন, চার্জিং অবকাঠামো তৈরিতে পিপিপি মডেলের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিতের পাশাপাশি একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো অপরিহার্য। তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ লাখ থ্রিহুইলার চলাচল করলেও বিআরটিএ নিবন্ধিত ইভি গাড়ির সংখ্যা মাত্র ৬৬৯টি। সম্ভাবনাময় এ খাতের বিকাশে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিইপিআরসি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওয়াহিদ হোসেন বলেন, ইভি খাতের প্রত্যাশিত সাফল্য পেতে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। দেশের অর্থনীতি যেহেতু বেসরকারি খাতের উদ্যোগে পরিচালিত হয়, তাই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ইভি খাতের সঙ্গে সরকারের একাধিক সংস্থা সম্পৃক্ত থাকায় একটি সমন্বিত সেল বা সংস্থা গঠন করা সম্ভব হলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ এবং সারাদেশে বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের সঠিক পরিসংখ্যান প্রণয়নের ওপরও তিনি জোর দেন।
শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, ইভি খাতের নীতিমালার একটি খসড়া এরই মধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের নেওয়া নীতিমালার মূল লক্ষ্য আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। সংশ্লিষ্ট সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি বাস্তবসম্মত ও যুগোপযোগী সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে বলেও জানান তিনি।
সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (আইআইটি) শিবির বিচিত্র বড়ুয়া, স্রেডার পরিচালক (যুগ্ম-সচিব) মো. আমিনুর রহমান, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম-সচিব ড. মো. মোকছেদ আলী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী মো. মফিজুল ইসলাম, বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান, বিএসআরইএয়ের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, বাংলাদেশ অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বামা) সভাপতি ও রানার অটোমোবাইলস পিএলসির চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান, ইডকলের সহ-সভাপতি তানভীর ইবনে বাশার এবং আকিজ মটরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আমিন উদ্দিন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, সরকারি পরিসংখ্যানে এ পর্যন্ত মাত্র ৭০০টি ইভি নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে দেশের সড়কে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রিক গাড়ি চলাচল করছে। তাই সহায়ক নীতিমালা ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দিতে সঠিক পরিসংখ্যান জরুরি। তিনি জানান, শুল্ক ও অশুল্ক কাঠামো আরও সহজীকরণের লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে কাজ করছে।
বামার সভাপতি হাফিজুর রহমান খান বলেন, ইভি খাত নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। এ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও রপ্তানিতে গুরুত্ব দিলে দেশের রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
স্রেডার পরিচালক মো. আমিনুর রহমান জানান, এ পর্যন্ত ৩২টি ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৯টি এরই মধ্যে স্থাপিত হয়েছে। চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং ইভি যানবাহন আমদানিতে মান নিয়ন্ত্রণের ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।
ড. মো. মোকছেদ আলী বলেন, দেশের জনগণের জন্য টেকসই যানবাহন নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ খাতের নির্ধারিত শুল্কহার কমানোর জন্য কাজ করছে।
বিপিডিবির প্রধান প্রকৌশলী মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন না থাকায় এ খাতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সরকারের কাছে নেই। এছাড়া নিম্নমানের ব্যাটারি ব্যবহারের কারণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।
বিএসআরইএয়ের সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, পরিবহন খাতে প্রতিবছর প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি প্রয়োজন, যার অধিকাংশই আমদানিনির্ভর। পরিবহন খাতে ইভির ব্যবহার বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. এহসান বলেন, নিজস্ব সক্ষমতা যাচাই না করায় এ খাতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, দেশে থ্রিহুইলার ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন ডিজেল আমদানি কমেছে, ফলে সরকারের ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে।
ইডকলের সহ-সভাপতি তানভীর ইবনে বাশার বলেন, ইভির ব্যবহার বাড়াতে দ্রুত চার্জিং স্টেশন স্থাপন, আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সহায়তা প্রয়োজন।
আকিজ মটরসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আমিন উদ্দিন জানান, ইভিতে জ্বালানি ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ সাশ্রয়ী। তাই এর ব্যবহার বাড়াতে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
মুক্ত আলোচনায় বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক ইলেকট্রিক থ্রিহুইলার এবং ইভি খাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উৎপাদনে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
ডিসিসিআইয়ের প্রাক্তন সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ বলেন, ঢাকায় নতুন দুই হাজার ইলেকট্রিক বাস নামানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে যথাযথ পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠান শেষে জ্বালানি নীতিমালা, উদ্ভাবন এবং এ খাতের বাজার উন্নয়নের লক্ষ্যে ডিসিসিআই ও বিএসআরইএর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ডিসিসিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী এবং বিএসআরইএয়ের জেনারেল সেক্রেটারি ইঞ্জিনিয়ার মো. আতাউর রহমান সরকার নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন।
এসময় ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মো. সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এনএস/একিউএফ








