সেলিব্রেটিদের নিয়ে একটা গল্প বলি। আমি একবার একটি দেশে গিয়েছিলাম, আমি দেশটির নাম নেব না, সেখানে আমার কয়েকজন সেলিব্রেটির সাথে দেখা হয়েছিল। এরা এমন সেলিব্রেটি ছিলেন যাদের অনলাইনে ৩০ বা ৪০ মিলিয়ন বা কারো কারো ১০০ মিলিয়ন ফলোয়ার ছিল। অর্থাৎ তারা বেশ বড় মাপের তারকা ছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন সিনেমার অভিনেতা ও অভিনেত্রী ছিলেন। আমি তাদের একজনের সাথে কথা বলছিলাম, যিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং তার দেশের মেয়েরা তার জন্য পাগল। তারা তার জন্য মরতেও প্রস্তুত। তাদের ফোনের ওয়ালপেপারে তার ছবি থাকে এবং এই জাতীয় আরও কত কী!
তিনি আমাকে বললেন, আমি কি আপনার সাথে এক মিনিটের জন্য একটু কথা বলতে পারি? আমি বললাম, অবশ্যই, চলুন কথা বলা যাক। তখন তিনি বললেন, আমি ভেতরে ভেতরে ভীষণ বিষণ্ণ, দুঃখী এবং শূন্যতা অনুভব করি। আমি বললাম, আপনি কেন শূন্যতা অনুভব করবেন? যেখানে ১০০ মিলিয়ন মানুষ আপনার মতো হতে চায়! তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো তারা যদি আপনার জায়গায় আসতে পারত। আর আপনি বিষণ্ণ? আপনি দুঃখী? সেই লক্ষ লক্ষ মেয়ে যা কিছু পেতে চায়, তার সবকিছুই তো আপনার আছে। আপনার সব আছে, তবে আপনি কেন দুঃখী?
তিনি বললেন, এই সব কিছুই আসলে ভুয়া, এই সব কিছুই কেবলই শূন্যতা। এটি আমাকে কিছুই দেয় না, এর কোনো অর্থ নেই। মানুষ যখন এখানে পৌঁছায়, তখন ভাবে এটি কত চমৎকার! এবং এখানে আসার আগে আমিও ভাবতাম এটি কত চমৎকার হবে। কিন্তু একবার যখন আমি এখানে পৌঁছালাম, তখন বুঝতে পারলাম যে এখানে আমার কোনো আসল বন্ধু নেই। প্রত্যেকেই কেবল আমার বাহ্যিক রূপকেই গুরুত্ব দেয়। কেউ আমাকে আর একজন মানুষ হিসেবেও দেখে না। আমি কারো সাথে একটু খোলা মনে কথাও বলতে পারি না।
আরও পড়ুন
কোরআনের বাণী মানুষের অন্তর বদলে দেয়: নোমান আলী খান
কারণ কী? কারণ তিনি যদি তার কোনো বন্ধুর সাথে কথা বলেন এবং নিজের ব্যক্তিগত কোনো বিষয়, কোনো দুঃখ বা জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা শেয়ার করেন, তাহলে সেই বন্ধুটি পরক্ষণেই চারদিকে বলে বেড়াবে যে, জানেন? আমি ওই সেলিব্রেটির ভেতরের খবর জানি। আমি তার গোপন খবর পেয়েছি। তিনি আমাকে একটি ব্যক্তিগত ইমেইলে বা মেসেজে এটি বলেছেন। ফলে তিনি কারও সাথে কিছুই শেয়ার করতে পারেন না, কারণ প্রত্যেকেই তার কথা ফাঁস করে দেবে। যেহেতু তারা যদি বলতে পারে যে আমি এই সেলিব্রেটির ভেতরের গল্প জানি, তাহলে তারা ভাইরাল হয়ে যাবে, তাই না? সুতরাং প্রত্যেকেই কেবল তার সুবিধা নেওয়ার জন্য তার চারপাশে থাকতে চায়, তাকে একজন মানুষ হিসেবে দেখার জন্য কেউ থাকে না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার কি কোনো আসল বন্ধু আছে? তিনি বললেন, আমার কোনো আসল বন্ধু নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি কাউকে বিশ্বাস করেন? তিনি বললেন, আমি এখন আমার মা-বাবাকেও বিশ্বাস করি না। তিনি এই পরিমাণ মানসিক আতঙ্কে ভুগছিলেন।
আসলে যা ঘটে তা হলো, দূর থেকে মনে হয় ওইসব মানুষের কাছে সব কিছু আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছে কিছুই নেই। আর দূর থেকে নবীদের দেখে মনে হয় তাদের কোনো খ্যাতি নেই, টাকা-পয়সা নেই, কিছুই নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছেই সবকিছু আছে। তারাই হলেন সেইসব মানুষ যাদের কাছে সবকিছু থাকে। দুনিয়ায় এই নাটক চলতেই থাকবে। পৃথিবীতে দলে দলে মানুষ কোনো না কোনোভাবে সেলিব্রেটি এবং ধনী ব্যক্তিদের অনুসরণ করতে থাকবে। অবশেষে এমন এক সময় আসবে যখন আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে এবং আমরা আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াব।
আরও পড়ুন
নোমান আলী খানের বক্তব্য / আল্লাহ যেভাবে শত্রুর মুখোশ খুলে দেন
কোরআনের সুরা বাকারায় আল্লাহ তাআলা বলেছেন, (কেয়ামতের দিন) যাদেরকে অনুসরণ করা হত তারা অনুসরণকারীদের সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্কের কথা অস্বীকার করবে, তারা শাস্তি দেখবে আর তাদের মধ্যকার যাবতীয় সম্পর্ক সম্বন্ধ ছিন্ন হয়ে যাবে। (সুরা বাকারা: ১৬৬)
এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করছেন, যারা ওইসব সেলিব্রেটি এবং ধনী ব্যক্তিদের অনুসরণ করেছিল এবং যাদের অনুসরণ করা হয়েছিল হাশরের ময়দানে তাদের কী অবস্থা হবে। হাশরের ময়দানে তো সবাইকে একসাথে সমবেত করা হবে। হাশরের ময়দানে কেউ আর সেলিব্রেটি থাকবেন না। সেলিব্রেটিদের চারপাশে কোনো বডিগার্ড বা নিরাপত্তা প্রহরী থাকবে না। তারা অন্য সবার মতোই একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে থাকবেন। সবাই একই রকম বিপদে থাকবেন।
তখন সেলিব্রেটিদের কাছে তাদের অনুসারীরা যাবে এবং বলবে, আমরা সারা জীবন আপনাকে অনুসরণ করেছি। আমরা আপনার প্রতিটি ভিডিও রিলিজ, প্রতিটি পডকাস্ট, প্রতিটি টিকটক রিলিজ, প্রতিটি টুইট, প্রতিটি পোস্ট শুনতাম। আপনি যা বলেছেন তার সবকিছু আমি অনুসরণ করেছি। আমি আপনার সবচেয়ে বড় ভক্ত। আপনি কি আমাদের কোনো সাহায্য করতে পারেন? কারণ আপনি যেভাবে পোশাক পরতেন, আপনার কারণে আমি সেভাবে পোশাক পরেছি। আপনি যেভাবে কথা বলতেন, আপনার কারণে আমি সেভাবে কথা বলেছি। আমি আপনার সব গান মুখস্থ করেছি ইত্যাদি ইত্যাদি।
দুনিয়ার ধনী ব্যক্তি ও সেলিব্রেটিরা তখন কী উত্তর দেবে তা আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতে বলেছেন।
হাশরের ময়দানকে কিন্তু 'বাস্তবতার দিন'ও বলা হয়, এটি মনে রাখবেন। আপনারা জানেন এর অর্থ কী? এই মুহূর্তে আপনারা কোনো কিছুকে বাস্তবতা মনে করছেন, কিন্তু হাশরের ময়দানে আপনারা জানতে পারবেন যে আসল বাস্তবতা কী ছিল। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে তাদের কাছে সবকিছু আছে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে তারা অনুসরণের যোগ্য। কিন্তু বাস্তবতার দিনে তাদের অনুসারীরা যখন বলবে, আপনি কি আমাদের সাহায্য করতে পারেন? তখন যাদের অনুসরণ করা হতো তারা বলবে, আপনাদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এমনকি জানিও না আপনারা কারা। দয়া করে আমার কাছ থেকে চলে যান।
অথচ তারা যখন এই দুনিয়ায় ছিল, তখন তারা বলত, হেই গাইজ, লাইক এবং সাবস্ক্রাইব করুন। আপনাদের অনেক ভালোবাসি। আপনারা না থাকলে আমি আজ এখানে আসতে পারতাম না। আমি আমার ভক্তদের ভালোবাসি। ইত্যাদি ইত্যাদি, তাই না? আর হাশরের ময়দানে তারা বলবে, এই লোকেদের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি জানি না এরা কারা!
আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়ার বাস্তবতা বোঝার তওফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র: লেখাটি নোমান আলী খানের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত তার "Following Celebrities, Chasing Fame" শীর্ষক বক্তব্য অবলম্বনে রচিত।
আরও পড়ুন
নোমান আলী খান / আপনার সন্তানকে সুরক্ষিত রাখবেন কীভাবে? কোরআন যে শিক্ষা দেয়
ওএফএফ








