হতাশা আর গৌরবের ব্যবধান কতটুকু? হ্যারি কেইনকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরটা হবে—মাত্র ১১ মিনিট। আটলান্টায় তখন ইংলিশ সমর্থকদের চোখে অন্ধকার। ডিআর কঙ্গোর কাছে ১-০ গোলে পিছিয়ে বিশ্বসেরা তারকায় ঠাসা ইংল্যান্ড দাঁড়িয়ে ছিল আরেকটি অপ্রত্যাশিত বিদায়ের সামনে। গ্যালারিতে নেমে এসেছিল অস্বস্তিকর নীরবতা, মাঠে ফুটবলারদের শরীরী ভাষাতেও ফুটে উঠছিল আত্মবিশ্বাসের অভাব। ঠিক সেই সময়ই দৃশ্যপটে হাজির হন হ্যারি কেইন। অভিজ্ঞতা, নেতৃত্ব আর গোল করার সহজাত ক্ষমতা দিয়ে মাত্র ১১ মিনিটে বদলে দেন পুরো ম্যাচের চিত্র।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব বরাবরই স্নায়ুর পরীক্ষা। সামান্য একটি ভুল, একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কিংবা একটি সুযোগ হাতছাড়াই শেষ করে দিতে পারে চার বছরের স্বপ্ন। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ার পর ইংল্যান্ডের খেলায় সেই চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আক্রমণে ছিল না ধার, মাঝমাঠে ছিল না ছন্দ, আর রক্ষণে দেখা যাচ্ছিল অস্থিরতা। ২০১৬ সালে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ইউরোর সেই হতাশাজনক বিদায় কিংবা বড় টুর্নামেন্টে বারবার ব্যর্থতার স্মৃতি যেন আবারও তাড়া করছিল থ্রি লায়নদের। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে কোচ টমাস টুখেলের কপালেও তখন স্পষ্ট উদ্বেগ। এই ম্যাচে হার মানে শুধু বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নয়, প্রশ্নের মুখে পড়ত তাঁর চাকরিও।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে বক্সে ফাউলের শিকার হয়েও পেনাল্টি পাননি কেইন। উল্টো ডাইভ দেওয়ার অভিযোগে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। তখন অনেক সমর্থকই হয়তো আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু কেইন বরাবরই বড় ম্যাচের খেলোয়াড়। যিনি চাপের মুহূর্তেই নিজের সেরাটা বের করে আনতে জানেন।
দ্বিতীয়ার্ধে হাইড্রেশন ব্রেকের পর ডেকলান রাইস ও অ্যান্থনি গর্ডনদের নিয়ে আক্রমণের তীব্রতা বাড়ায় ইংল্যান্ড। আর সেখান থেকেই শুরু হয় কেইনের জাদু। ৭৫ মিনিটে গর্ডনের নিখুঁত ক্রস কঙ্গোর রক্ষণভাগের ওপর দিয়ে ভেসে আসতেই দারুণ এক হেডে সমতায় ফেরান ইংলিশ অধিনায়ক। মুহূর্তেই স্বস্তির ঢেউ নেমে আসে পুরো স্টেডিয়ামে।
তবে কেইনের কাজ তখনো শেষ হয়নি। ম্যাচের ৮৬তম মিনিটে বক্সের ভেতরে কয়েকজন ডিফেন্ডারের চাপে থেকেও অসাধারণ ভারসাম্য বজায় রেখে শরীর ঘুরিয়ে ডান পায়ের জোরালো শটে বল পাঠিয়ে দেন জালে। কঙ্গোর গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। মাত্র ১১ মিনিটের ঝড়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়ে ইংল্যান্ডকে নিশ্চিত করেন শেষ ষোলোর টিকিট।
এই জোড়া গোল শুধু ইংল্যান্ডকে পরের পর্বে তোলেনি, কেইনকেও নিয়ে গেছে নতুন এক উচ্চতায়। বিশ্বকাপে এটি তাঁর ১৩তম গোল। এর মাধ্যমে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন পেলের ১২ গোলকে। বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ডের জার্সি মিলিয়ে এই মৌসুমে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭২-এ। চলতি বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকার ওপরের দিকে থাকা এই স্ট্রাইকার এখন ব্যালন ডিঅরের অন্যতম শক্তিশালী দাবিদার।
অথচ ক্যারিয়ারের বড় একটি সময় তাঁকে শুনতে হয়েছে ‘শিরোপাহীন রাজা’ তকমা। টটেনহামে বছরের পর বছর গোল করেও ট্রফি জেতার আক্ষেপ ছিল। বায়ার্ন মিউনিখে এসে সেই অপূর্ণতা ঘুচেছে। এখন তাঁর লক্ষ্য ইংল্যান্ডকে শিরোপার আনন্দে ভাসানো।
ইংল্যান্ডের দল যতই তারকায় ভরা হোক, সংকটের মুহূর্তে তাদের সবচেয়ে বড় ভরসা এখনো একজনই—হ্যারি কেইন। মেক্সিকো সিটিতে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা। তবে আটলান্টার রাত অন্তত মনে করিয়ে দিল, সব হিসাব যখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চলে যায়, তখনো একজন হ্যারি কেইন ম্যাচের গল্প নতুন করে লিখে দিতে পারেন।








