বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের চাহিদা চলতি ২০২৬ সালে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল কমতে পারে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি শুরু হওয়ার পর এটিই হবে প্রথম বছর যখন বিশ্বে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমবে।

আইইএ’র আজ শুক্রবার প্রকাশিত সর্বশেষ তেলসংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে তেল উৎপাদন ও রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এরই প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা এ বছর সংকুচিত হতে চলেছে।

সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের এই সংকোচন মূলত নির্দিষ্ট কিছু তেলজাত পণ্য এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলকেন্দ্রিক। আর সেটি হলো, তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। ইরান এই নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ায় পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল রপ্তানি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

তবে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলেও জানিয়েছে আইইএ। একই সঙ্গে বিশ্বকে সতর্ক করে সংস্থাটি বলেছে, সংঘাত আবারও তীব্র হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে এবং ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

আইইএর এই পূর্বাভাস নির্ভর করছে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা এবং ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার ওপর। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এ সপ্তাহে নতুন করে বৈরিতা দেখা দেওয়ায় সেই সম্ভাবনা ক্রমেই অনিশ্চিত বা ক্ষীণ হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি জাহাজ হামলার মুখে পড়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও প্রায় স্থবির হয়ে গেছে।

আইইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বছরের শেষ দিকে বৈশ্বিক তেলের বাজারে সরবরাহ আবারও চাহিদার তুলনায় বেশি হতে পারে। তবে এই পূর্বাভাস নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার ওপর। এতে উৎপাদকেরা আবার তেলক্ষেত্র চালু করতে পারবেন এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ অন্যান্য অঞ্চলের পরিশোধনাগারগুলো পুনরায় তেলজাত পণ্য পাঠানো শুরু করতে পারবে।’

সংস্থাটি বলছে, এই সপ্তাহে উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে গোলাগুলির ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তেলের বাজার স্বাভাবিক করতে স্থায়ী শান্তিচুক্তি অপরিহার্য।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে আজ শুক্রবার তেলের দাম কিছুটা কমেছে। সেপ্টেম্বর মাসে যে ব্রেন্ট ক্রুড তেল সরবরাহ করা হবে তার ব্যারেলপ্রতি দাম আজ ৭৬ দশমিক ২৫ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও স্থিতিশীল রয়েছে, প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ৯ ডলার।

ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তেলবাজারবিষয়ক প্রধান টরিল বোসোনি আজ সিএনবিসির ‘স্কোয়ক বক্স ইউরোপ’ অনুষ্ঠানে বলেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি ঘটবে না। কারণ, অঞ্চলটিতে (মধ্যপ্রাচ্য) এখনো ‘খুবই অনিশ্চিত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি’ বিরাজ করছে।

টরিল বোসোনি অবশ্য বলেন, ‘অন্য উৎপাদকদের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের আগে যে পরিমাণ চাহিদা থাকবে বলে আমরা ধারণা করেছিলাম, এখন তার চেয়ে কম। ফলে বছরের শেষ দিকে এবং আগামী বছর বাজার আবারও উদ্বৃত্তের দিকে যেতে পারে। এতে বাজার কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং দেশগুলোর সামনে আবার মজুত গড়ে তোলার সুযোগ আসবে।

এদিকে এমএস নাউ বৃহস্পতিবার এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোয় উভয় দেশের মধ্যে বিমান হামলা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ‘কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা’ চালিয়ে যাবে এবং সংঘাতের সমাধান খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতিতে তারা অটল রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

এর আগে তুরস্কের আঙ্কারায় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ৩২টি দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা জোট ন্যাটোর (উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা) সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’।