ইরানের একটি বিশেষায়িত শিশু ক্যানসার হাসপাতালের খুব কাছে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত যুদ্ধাপরাধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে ইরান। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার সঙ্গে এই মার্কিন হামলার তুলনা করেছে দেশটি।

ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আহভাজের ‘শহীদ বাঘাই স্পেশালাইজড হাসপাতাল’ এলাকায় এই বর্বর হামলা চালানো হয়। হামলার পর তীব্র আতঙ্কের মধ্যে হাসপাতালটি থেকে কেমোথেরাপি নেওয়া ২১১ জন শিশু রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

সেতু-বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকবে না: ট্রাম্পের হুমকির পরেই ইরানে ভয়াবহ হামলা

হাসপাতালের কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণ

আহভাজের ওই বিশেষায়িত হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানান, বিস্ফোরণটি এতটাই তীব্র এবং কাছাকাছি ছিল যে তারা ভেবেছিলেন হাসপাতালেই সরাসরি আঘাত হানা হয়েছে। হামলার তীব্রতায় পুরো হাসপাতাল কেঁপে ওঠে। চারদিকে ধোঁয়া ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে বলেন, এই বর্বর হামলা গাজায় চিকিৎসাকেন্দ্রে ইসরায়েলি নৃশংসতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের চরম দুর্ভোগ ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে। জীবন বাঁচানোর জন্য লড়াই করা নিষ্পাপ শিশুদের ওপর এমন হামলা একটি কাপুরুষোচিত যুদ্ধাপরাধ।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপক ড. মজিদ বুআজার জানান, হামলার কারণে ২১১ জন রোগীকে বাধ্য হয়ে স্থানান্তর করতে হয়েছে। হাসপাতালের আরেক কর্মী জানান, স্থানান্তরিত রোগীরা সবাই বিশেষ যত্নপ্রাপ্ত এবং ক্যানসার আক্রান্ত শিশু। তাদের অনেকেই অক্সিজেন ও ভেন্টিলেটর সাপোর্টে ছিল। জীবন বাঁচাতে কেউ শিশুকে কোলে নিয়ে, কেউ হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা নিয়ে, আবার কেউ হুইলচেয়ারে করে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন।

আরও পড়ুন

জর্ডান-বাহরাইনে মার্কিন নৌ ও বিমানঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিলো ইরান

আহভাজ শহরের ওই হাসপাতালটির পরিচালক রেজা বাজার জানিয়েছেন, মার্কিন হামলার কারণে হাসপাতালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এটি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী।

 

যুক্তরাষ্ট্র এই নির্দিষ্ট হাসপাতাল এলাকায় হামলার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা বৃহস্পতিবার ইরানে নতুন করে দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান জানিয়েছে, তারা জর্ডান ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। সংঘাত আরও বিপর্যয়কর স্তরে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মিনাব হামলার ‘ভয়ংকর স্মৃতি’

চলতি যুদ্ধ এবং গত বছরের জুনের সংঘাত মিলিয়ে ইরানের অন্তত ১৭টি হাসপাতাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহভাজের এই হাসপাতালটি ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ফলে এর কাছাকাছি হামলা ইরানিদের মনে ‘মিনাব প্রাথমিক বিদ্যালয়’ হামলার ভয়ংকর স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।

চলমান যুদ্ধের প্রথম দিনে দক্ষিণ ইরানের মিনাব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর যৌথ হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু নিহত হয়। বিভিন্ন প্রমাণাদি ইঙ্গিত করে যে, ওই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী ছিল। এই ঘটনা নিয়ে মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটররা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যেন আগামী সপ্তাহের মধ্যে ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও এই ঘটনার তদন্ত শেষে জানিয়েছে, ওই শিশু নিহতের ঘটনায় ওয়াশিংটনই দায়ী ছিল। সংস্থাটি একে ‘লজ্জাজনক গোয়েন্দা ব্যর্থতা’ অথবা একটি ‘বেপরোয়া ও নির্বিচার হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/