ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে নজিরবিহীন আয়োজন করেছে ইরান। দুই দেশ-ইরান ও ইরাকের পাঁচ শহরে এ আয়োজনের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ। কয়েক কোটি মানুষ ও বিশ্বের শতাধিক দেশের শীর্ষ নেতা ও প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এ শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আগামী ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার তাকে দাফন করা হবে। জন্মস্থান মাশহাদেই চিরনিন্দ্রায় শায়িত হবেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলায় সপরিবারে নিহত হন খামেনি। পরে যুদ্ধ শুরু হলে তা ৪০ দিন ধরে চলে। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি হয়। এ প্রেক্ষাপটে চার মাসের বেশি সময় পর শুরু হলো আলী খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। তাকে দাফন করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবসের দিনে।

বিবিসি জানায়, শুক্রবার তেহরানে ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাবেক এ সর্বোচ্চ নেতার লাশ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। আজ শনিবার সকাল স্থানীয় সময় ভোর ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে, যেখানে দর্শনার্থীরা আগামীকাল রোববার বিকাল পর্যন্ত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন। আগামী বৃহস্পতিবার নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হবে।

কর্তৃপক্ষের ধারণা, এ আয়োজনে অন্তত দুই কোটি মানুষের উপস্থিতি হতে পারে। ইরানে কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের জন্য এর আগে কখনো এত বড় পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। ইরানের কর্মকর্তারা এটাকে ‘শতাব্দী সেরা আয়োজন’ বলে অভিহিত করছেন। পুরো কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসির তেহরানভিত্তিক প্রধান প্রাদেশিক ইউনিট মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোর।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, কর্তৃপক্ষ তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলো আজ শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। যান চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে শহরের কেন্দ্রস্থলের বেশির ভাগ অংশে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। তেহরানের আকাশসীমা শুক্রবার থেকে আংশিকভাবে এবং সোমবার থেকে পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

জানাজা, দাফনসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে তেহরানে আসা রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা সবচেয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ আয়োজনে কোন কোন দেশ অংশ নিচ্ছে এবং কারা নিচ্ছে না, সেদিকে নজর রাখছে তেহরান। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, উপস্থিত ব্যক্তিদের পাশাপাশি কারা আয়োজন থেকে দূরে থাকবেন, সেটিও একই গুরুত্ব বহন করতে পারে।

কর্মকর্তারা জানান, কয়েক ডজন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। প্রায় ৮০০ জন বিদেশি সাংবাদিক এ অনুষ্ঠান কভার করছেন। জানাজা উপলক্ষ্যে এরই মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও (বীরবিক্রম) তেহরানে গেছেন।

আজ ভোর ৬টায় তেহরানের ইমাম খোমেনি মোসাল্লায় ছয় দিনের এ আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। রোববার বিকাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কোরের কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হবে। দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেকে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ করে বের হতে পারেন।

আগামী মঙ্গলবার তেহরানের দক্ষিণে কোম শহরে স্থানান্তর করা হবে আয়োজন। সেখানে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজে ইমামতি করবেন শিয়াদের জ্যেষ্ঠ আলেম। পরদিন বুধবার আলী খামেনির মরদেহ প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফে নেওয়া হবে। শোকযাত্রার পর ইরাকের কারবালায় ইসলামের খলিফা হযরত আলীর সমাধিস্থলে আনুষ্ঠানিকতা পালন করে লাশ আবার ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে।

আগামী বৃহস্পতিবার খামেনিকে জন্মশহর মাশহাদে ইমাম রেজার সমাধিস্থলে তাকে সমাহিত করা হবে। প্রতিবছর ওই স্থানটি লাখো মানুষ পরিদর্শন করেন। সূত্র জানায়, পরে ইরানজুড়ে আরও ৪০ দিন চলবে শোকানুষ্ঠান। দাফনের প্রথম বার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণসভা ও কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতাদের চিরবিদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক গুরুত্বও থাকে। কারও কারও মতে, এ অনুষ্ঠান ইরানি রাষ্ট্রের জন্য ঐক্যের বার্তা দেওয়া এবং নিজেদের রাজনৈতিক বয়ানকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। এটি খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করা এবং তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনির প্রতি সমর্থন জোরদার করার ক্ষেত্রেও প্রতীকী ভূমিকা রাখতে পারে।

শুক্রবার সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে শাসন তো পরিবর্তন হয়ইনি, উলটো তারা একরোখাভাবে তাদের নিহত শীর্ষ নেতাকে প্রতিরোধের প্রতীক হিসাবে তুলে ধরেছে। আলী খামেনিকে দাফনের দিনটিও তাৎপর্যপূর্ণ। ওইদিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস। আর পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটছে মুসলিমদের কাছে পবিত্র মহররম মাসে। গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে খামেনির ছেলেদের জনসমক্ষে দেখা যায়নি। অনুষ্ঠানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অংশগ্রহণ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তিনি জনসমক্ষে আসবেন কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।

ইরানের স্পিকারের সঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদের বৈঠক : ইরানের স্পিকার বাঘের গালিবাফকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। শুক্রবার তেহরানে গালিবাফের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এ আমন্ত্রণ জানান। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি গতকালই তেহরান পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানান ইরানের ডেপুটি স্পিকার হামিদ রেজা হাজি বাবাই।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে গালিবাফ বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে আন্তরিক স্বাগত জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানান এবং শোক প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি ইরানের সরকার ও ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের প্রতি বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে সমবেদনা ও সংহতি জ্ঞাপন করেন। তিনি ইরান ও বাংলাদেশের শতাব্দী প্রাচীন বন্ধুত্ব, গভীর সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন সম্প্রতি ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সই করা শান্তি সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে ইরানের স্পিকার গালিবাফের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন। এ চুক্তি ইরানসহ পুরো অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ এ শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন বজায় রাখবে। সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বৈঠকে ইরানের ডেপুটি স্পিকারসহ ইসলামিক কনসালটেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য ও তেহরানে বাংলাদেশের দূতাবাসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।