ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নির্মিত ২৩৬ কিলোমিটার নতুন রেললাইন দেশের অন্যতম বৃহৎ রেল অবকাঠামো প্রকল্প। প্রায় ৩৮ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে এই প্রকল্প। জনবলসংকট, সীমিত ট্রেন চলাচল এবং যথেষ্ট নিরাপত্তা না থাকার সুযোগে ব্যয়বহুল এ রেলপথের বিভিন্ন স্থাপনা ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বিঘ্নিত হচ্ছে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন রেললাইন থেকে প্রায় ৯৩ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামোর অংশ ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়েছে। সম্প্রতি পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট (সিএসসি) এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি বিস্তারিত চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে পুরো প্রকল্প করিডরজুড়ে নিয়মিত চুরি ও নাশকতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, চুরি হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রেললাইন-সংশ্লিষ্ট ৪২ ধরনের সামগ্রী রয়েছে। এ ছাড়া সেতু, কালভার্ট, আন্ডারপাস ও ভায়াডাক্ট থেকে ৮ ধরনের; স্টেশন, ভবন ও গেট থেকে ১৩ ধরনের; বৈদ্যুতিক ১৬ ধরনের এবং সিগন্যাল ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থার ১৪ ধরনের সরঞ্জাম চুরি হয়েছে।

চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে গার্ড রেলের স্ক্রু স্পাইক, ফিশ বোল্ট, ইলাস্টিক রেল ক্লিপ, ফিশ প্লেট, টার্ন আউট বোল্ট, গেজ প্লেট, বাফারের বিভিন্ন অংশসহ লাইনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। সেতু ও আন্ডারপাসের চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে স্টিল গ্রেটিং প্লেট, হ্যান্ডরেল, রেলিং, জয়েন্ট প্লেট ও ট্র্যানজিশন পাইপ।

স্টেশন ও ভবনের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে পাম্প হাউসের মোটর, পানির মিটার, দরজার লকিং সিস্টেম, জানালার কাচ, গ্রিল, ম্যানহোল কভার, টয়লেটের স্যানিটারি ফিটিংস, পানির কল ও ফ্যান চুরি হয়েছে। আরও চুরি হচ্ছে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার কেব্‌ল, ডিস্ট্রিবিউশন বোর্ড, মোটর কন্ট্রোল বক্স, সাবমারসিবল পাম্প এবং সিগন্যাল ব্যবস্থার কেব্‌ল, ট্র্যাক ট্রান্সফরমার, অ্যাক্সেল কাউন্টার, পয়েন্ট মেশিন ও পয়েন্ট মোটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ।

রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সিগন্যাল সরঞ্জাম ও তার চুরির কারণে ঝকঝকে নতুন এই লাইনের কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এটি ট্রেন পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি করছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

মাদারীপুরের শিবচর রেলওয়ে স্টেশন সূত্র আজকের পত্রিকাকে জানান, গত ১৯ জুন রাতে স্টেশনের সিগন্যাল পয়েন্টের কয়েকটি ট্র্যাক পট (ট্র্যাক সার্কিটের যন্ত্রাংশ) খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর মাত্র কয়েক দিন আগে, ৯ জুন একই স্টেশনের শিবচর প্রান্তের সিগন্যাল পয়েন্টের সবগুলো ট্র্যাক পট চুরি হয়। এরও আগে গত ১৮ মার্চ স্টেশনটির ট্র্যাক পট খুলে নিয়ে যায় চোরেরা।

শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তারা জানান, যন্ত্রাংশ চুরি হলে সংশ্লিষ্ট ব্লক ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে এবং ট্রেন পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। এতে ট্রেন চলাচলে সময় বেশি লাগছে। দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে। দুর্ঘটনা এড়িয়ে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে রেলওয়ের কর্মীদের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ‘লুক স্টিক’ ব্যবহার করে পেপার লাইন ক্লিয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। ট্রেন চলাচলের সময় রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করতে হওয়ায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন তাঁরা।

শিবচরের পদ্মা রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, সরঞ্জাম চুরি বেড়ে চলেছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

শিবচর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার মোহাম্মদ সেলিম হোসেন বলেন, ‘ঘন ঘন ট্র্যাক পট চুরির কারণে ট্রেন পরিচালনায় অনেক সমস্যা হচ্ছে। ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। পুলিশ টহল অনেক কমে গেছে। সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ রক্ষায় রেলপথে স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বাহিনী নিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।’

রেল কর্তৃপক্ষকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টের (সিএসসি) পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ বুঝে নেওয়ার পর সেগুলোর হেফাজত, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে প্রকল্পের সম্পদ ও অবকাঠামো চুরি, ভাঙচুর ও নাশকতা থেকে সুরক্ষায় পর্যাপ্ত জনবল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উল্লেখযোগ্য সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের পুরো পথে বিভিন্ন সময়ে উপকরণ চুরি ও নাশকতার বহু ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে রেল চলাচলের নিরাপত্তার ওপরও গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রায় নিয়মিতভাবে চুরি ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বড় ধরনের রেল দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

চুরির কারণে নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রকল্পের সরঞ্জাম চুরির বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকলেও বর্তমানে যে জনবল রয়েছে, তা দিয়েই পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ১৭টি নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং তিনটি পুরোনো স্টেশন সংস্কার করা হয়েছে। সংস্কার করা স্টেশনগুলো হলো কমলাপুর, কাশিয়ানী ও ভাঙ্গা। কিন্তু বর্তমানে মাত্র ১২টি স্টেশনে ট্রেন থামে এবং যাত্রী ওঠানামা করতে পারে।

চালু থাকা স্টেশনে বর্তমানে কেবল কয়েকজন অস্থায়ী ওয়েম্যান ও প্রহরী দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে স্টেশনগুলো দিনের বেশির ভাগ সময় ফাঁকাই থাকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক স্টেশন ভবনগুলো ব্যবহার না হওয়ার কারণে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় চুরির ঘটনা ঘটে চলেছে।

রেল সূত্র জানিয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখনো প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত ১ হাজার ৫৭৪ জন নতুন জনবল নিয়োগের অনুমোদন দেয়নি। ইতিমধ্যে পাঁচবার সেই প্রস্তাব ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্থায়ী জনবল নিয়োগ না হওয়ায় বেশির ভাগ স্টেশন এখনো পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।

লোকবলের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ‘জনবলসংকটের বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। তবে বিদ্যমান শূন্য পদগুলো পূরণ না করে কেন নতুন করে জনবল চাওয়া হচ্ছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তা জানতে চেয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে আবারও জানানো হবে, বিদ্যমান শূন্য পদের বাইরে প্রকল্পগুলোতে বিশেষায়িত অনেক পদ রয়েছে, যেগুলোর জন্য আলাদা বিবেচনায় জনবল প্রয়োজন।’

২০২৩ সালে প্রকল্পের ঢাকা-ভাঙ্গা অংশে এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা থেকে সরাসরি যশোর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ট্রেন চলাচল শুরু হয়। বর্তমানে এই রুটে ছয়টি ট্রেন নিয়মিত চলাচল করছে। তবে নতুন রেললাইন চালু হলেও ট্রেনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, পুরো রুট দিয়ে প্রতিদিন ৪৮টি যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল, কোচ ও ইঞ্জিনের অভাবে এখনো সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পে সরঞ্জাম চুরির ঘটনাকে পরিকল্পনা ও সুশাসনের ঘাটতির ফল বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রেল উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেবা পরিচালনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হয়। প্রকল্প অনুমোদনের সময় এসব বিষয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলেই এখন সরঞ্জাম চুরির ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রকল্প পরিকল্পনা ও অনুমোদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এ দায় এড়াতে পারে না। চুরির কারণে আধুনিক ব্যবস্থাগুলো অকার্যকর হয়ে পড়লে বিপুল বিনিয়োগের সুফলও পাওয়া যাবে না।’