মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, “ইরানের সঙ্গে কাতারের রাজধানী দোহায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে, আবার সম্ভবত নয়।। আমরা সেটি দেখতে পাব।”
মঙ্গলবার (৩০ জুন) হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এই মন্তব্য করেন ট্রাম্প। খবর পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের।
এসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, “ইরানের বিরুদ্ধে আমরা সামরিকভাবে জয়ী হচ্ছি।” তিনি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে বলে তার পূর্বশর্তেরও পুনরাবৃত্তি করেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা দলগুলোর চলতি সপ্তাহে দোহায় পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে ইরান সোমবার জানিয়েছে, কোনো বৈঠকের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি। চলতি সপ্তাহের শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টার ঘটনা চার মাস ধরে চলা যুদ্ধ অবসানের অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতিকে পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প আলোচনা দলের নেতৃত্ব দিতে তার জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং দূত স্টিভ উইটকফকে কাতারে পাঠাচ্ছেন। অন্যদিকে, ইরান চলতি সপ্তাহে কাতারে তাদের একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল পাঠালেও, দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, এর সঙ্গে আমেরিকানদের সফরের ‘কোনো সম্পর্ক নেই’ এবং দুপক্ষের মধ্যে কোনো বৈঠকের সূচি নির্ধারিত হয়নি।
বাঘাই বলেন, “আগামী দিনগুলোতে আমেরিকান পক্ষের সাথে কোনো স্তরেই আমাদের কোনো আলোচনা বা বৈঠক হবে না।”
উভয় পক্ষ আদৌ বৈঠকে বসবে কি না- তা নিয়ে এই মতদ্বৈধতা ১৭ জুনের চুক্তির ভঙ্গুরতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি সংঘাতের সাময়িক অবসান ঘটানো, যা হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে বৈশ্বিক তেল সরবরাহকে বিঘ্নিত করেছে এবং নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি বাড়াতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নিজেদের অন্তত ৬০ দিন সময় দিয়েছিল। কিন্তু উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলায় অগ্রগতি থমকে গেছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এই সংকীর্ণ জলপথটি দিয়ে আগে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন করা হতো।
এই জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০০ ডলারের ওপরে চলে যায়, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে, যেখানে ট্রাম্পের নিজস্ব দল রিপাবলিকানের কিছু সদস্য আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালানোর জন্য প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেছেন।
এদিকে, ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দোহায় একটি বৈঠক হবে। তবে সুইজারল্যান্ডে ইরান ও মার্কিন দলগুলোর মধ্যকার আগের কারিগরি আলোচনার মতো না হয়ে, এবারের মূল ফোকাস থাকবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ এবং উত্তেজনা হ্রাসের ওপর।
পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত অন্য এক কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কারিগরি দলগুলো বুধবার কাতার এবং পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলাদাভাবে বৈঠক করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
হরমুজ নিয়ে ওয়াশিংটনে উত্তেজনা
ইরান প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাচ্ছে। তারা জানিয়েছে, এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে তারা ফি নেওয়ার এবং নির্ধারিত পথের বাইরে চলে যাওয়া জাহাজগুলোর চলাচলে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডে একটি সমঝোতা স্মারক স্বারক্ষিত হওয়ার পরও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন দিয়ে অন্তত দুটি বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত করেছে এবং এর জবাবে তারা ইরানের সামরিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান রবিবার ভোরে কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে।
উইটকফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার ফোনে কংগ্রেস সদস্যদের ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফ করেছেন। রিপাবলিকান সিনেটর স্টিভ ডেইনস সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা তাদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত রেখেছিলেন, তবে আলোচনাটিকে তিনি ‘গঠনমূলক’ বলে মনে করেন।
তবে সিনেটের শীর্ষ ডেমোক্র্যাট চাক শুমার এই ব্রিফিংকে ‘ত্রুটিপূর্ণ এবং বিস্তারিত তথ্যহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
শুমার বলেন, “আমেরিকাকে একটি ব্যয়বহুল যুদ্ধে টেনে আনার পর, ট্রাম্প প্রশাসন এখনো এমন একটি বিষয়ের নাম বলতে পারছে না যা এর বিনিময়ে আমেরিকানরা পেয়েছে। উল্টো, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আমার কাছে নিশ্চিত করেছেন যে, ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর বিপজ্জনক নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেই তেলের রাজস্ব হিসেবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লাভ করবে।”
ইরানের ফ্রিজ হওয়া সম্পদ মুক্তি
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সোমবার জানিয়েছেন, কাতারে আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদের মধ্যে ৬ বিলিয়ন ডলার অবমুক্ত করে ইরানে ফেরত দেওয়া হবে।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে- যার মধ্যে ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মওকুফের বিষয়টিও রয়েছে- ‘ইরানের জনগণের জন্য একটি বড় বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁখো সোমবার বলেছেন, তিনি উত্তেজনা কমাতে ওমানের সঙ্গে কাজ করছেন এবং হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণে অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন।
তবে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী ‘এক্স’ পোস্টে এর জবাবে লিখেছেন, ১৪ দফার পরিকল্পনা অনুযায়ী মাইন অপসারণের কাজ শুধুমাত্র ইরানই করবে। তিনি ফ্রান্সকে পরিস্থিতি আরো জটিল না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।








