মেক্সিকোর পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য জালিস্কোতে সাইকেল চোরদের খুঁজে বের করে বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বেঁধে রাখার একাধিক ঘটনা ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার পর মেক্সিকোর ‘ব্যাটমান’ নামে রহস্যময় এক ব্যক্তিকে খুঁজছে পুলিশ। স্থানীয়ভাবে ওই ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে ‘মেক্সিকোর ব্যাটম্যান’ নামে ডাকা শুরু হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইউকের খবরে বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে—অন্তত পাঁচজনকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তাদের কপালে স্প্যানিশ শব্দ ‘রাতেরো’ লেখা ছিল, যার অর্থ ‘চোর।’
কিছু ক্ষেত্রে অভিযুক্তদের মুখে বিড়ালের মতো গোঁফ ও গালে দাগ এঁকে দেওয়া হয়। কারও কারও মুখ ডাক্ট টেপ দিয়ে আটকেও রাখা হয়েছিল। তাদের পাশে সতর্কবার্তা টাঙিয়ে রাখা হয় এবং যেসব সাইকেল চুরির অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, সেগুলো ঘটনাস্থলের কাছেই রাখা হয়েছিল, যা অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রথম ঘটনাটি সামনে আসে ১৩ জুন। সেদিন লাগোস দে মোরেনো শহরে এক ব্যক্তিকে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর গলায় ঝোলানো কার্ডবোর্ডে তাঁকে চোর হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। এরপর কয়েক দিনের মধ্যে আরও চারজনকে প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতিতে বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজনকে বেঁধে রাখার আগে মারধরও করা হয়ে থাকতে পারে। তাদের শরীরে কাটা দাগ, আঘাতের চিহ্ন এবং মুখে রক্তের আলামত দেখা গেছে। এই ঘটনার পেছনে থাকা অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ‘লাগোস দে মোরেনোর ব্যাটম্যান’ নামে অভিহিত করেন প্রভাবশালী সাংবাদিক লুইস কারদেনেস।
স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অজ্ঞাতপরিচয় ওই ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অকার্যকারিতায় হতাশ হয়ে পড়েন এবং কমিকসের কাল্পনিক চরিত্র ব্যাটম্যানের মতো নিজেই ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তিকে পিঠে-পিঠ লাগিয়ে একই খুঁটির সঙ্গে ডাক্ট টেপ দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের মাথার ওপরে একটি গোলাপি রঙের সাইন ঝুলছিল এবং সামনে একটি সাইকেল রাখা ছিল।
জালিস্কো রাজ্যের নিরাপত্তা সচিব হুয়ান পাবলো হেরনান্দেজ জানিয়েছেন, এ ধরনের পাঁচটি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে পুলিশ এবং দায়ীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। জালিস্কোর প্রসিকিউটর সালভাদর গঞ্জালেজ দে লস সান্তোস বলেন, তদন্তকারীরা এমন কয়েকটি ঘটনা খতিয়ে দেখছেন যেখানে তরুণদের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছিল এবং পাশে এমন বার্তা দেওয়া হয়েছিল যাতে অন্যরা মোটরসাইকেল ও সাইকেল চুরি থেকে বিরত থাকে।
তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, ‘এই মুহূর্তে তারা ভুক্তভোগী।’ কারণ, তাদের বেআইনিভাবে হামলা ও আটকে রাখা হয়েছিল। পরে জরুরি সেবা কর্মীরা তাদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দেন। তবে যাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত চলছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, তারা এমন দুটি যানবাহন শনাক্ত করেছে যেগুলোর সঙ্গে এসব ঘটনার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
মেক্সিকো বহু বছর ধরেই সহিংস অপরাধের সমস্যায় ভুগছে। শুধু ২০২৩ সালেই দেশজুড়ে ৩৬ হাজারের বেশি সহিংস গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটিতে মোটরসাইকেল ও সাইকেল চুরিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। চুরি হওয়া এসব যান প্রায়ই অন্য অপরাধ সংঘটনে ব্যবহার করা হয়। মেক্সিকো স্টেটে কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ অপরাধে মোটরসাইকেল কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
যে জালিস্কো রাজ্যে এসব প্রতিশোধমূলক ঘটনা ঘটেছে, সেটি চুরির ঘটনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর একটি। প্রতিবেশী মেক্সিকো স্টেটও একই তালিকায় রয়েছে, যেখানে দেশটির রাজধানী মেক্সিকো সিটি অবস্থিত। দেশজুড়ে সংঘটিত মোট চুরির অর্ধেকেরও বেশি এই দুই রাজ্যে ঘটে। জালিস্কো একই সঙ্গে জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেলের (সিজেএনজি) শক্ত ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত। এটি মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী ও সহিংস অপরাধী সংগঠনগুলোর একটি।
ধারণা করা হয়, কার্টেলটির সদস্যসংখ্যা ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজারের মধ্যে। ২০১০ সালে এটি সিনালোওয়া কার্টেল থেকে আলাদা হয়ে গঠিত হয় এবং অল্প সময়েই দেশজুড়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া ফেন্টানিল ও অন্যান্য অবৈধ মাদকের বড় একটি অংশের জন্য সিজেএনজি দায়ী। বর্তমানে সংগঠনটিকে সিনালোয়া কার্টেলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।








