নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প ও কর্মসূচি নির্ধারণে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প ও ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। যেসব মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইতোমধ্যে এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেগুলোর তালিকা পাঠানোর পাশাপাশি যেসব মন্ত্রণালয়ে এখনো কোনো ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি নেই, তাদের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনটি অগ্রাধিকার প্রকল্প প্রস্তাব করতে বলা হয়েছে। আগামী ১২ জুলাইয়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট তথ্য জমা দেবে মন্ত্রণালয়গুলো। ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক (প্রশাসন) আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত চিঠিতে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠির সঙ্গে সংযুক্ত তালিকায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প ও ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচির খসড়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, মহানগর ও জেলা শহরে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা, প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং মশাবাহিত রোগ নির্মূলের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া শিক্ষা খাতে ‘আনন্দময় শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি ও আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণ’ কর্মসূচির আওতায় ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, লার্নিং ইয়ুথ হ্যাপিনেস, বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, শিক্ষা ব্যবস্থায় ক্রীড়া ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্তি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবার জন্য সুস্বাস্থ্য ও খাদ্যের অগ্রাধিকার এবং সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক তৈরির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ক্রীড়া উন্নয়নের লক্ষ্যে খেলাধুলাকে পেশা হিসাবে প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলক করা, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির মাধ্যমে ১২ থেকে ১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া, ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসম্পন্ন স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, দেশের সব উপজেলায় ক্রীড়া কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষক নিয়োগ, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যায়ক্রমে বিষয়ভিত্তিক ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিকেএসপি’র শাখা প্রতিষ্ঠা, সব মহানগরসহ গ্রামীণ জনপদে খেলার মাঠ সংরক্ষণ এবং দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিতদের খেলার সুযোগ এবং ক্রীড়া সরঞ্জাম ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন নিশ্চিত করার প্রস্তাবও অগ্রাধিকার কর্মসূচির তালিকায় স্থান পেয়েছে।

পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা ও পদ্মা ব্যারাজ উন্নয়ন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণ এবং সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ধর্মীয় ও সামাজিক খাতে খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানি, ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ ভাতা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থান, ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার প্রবর্তিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট শক্তিশালীকরণ এবং অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ের প্রধানদের জন্যও সমান সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি তালিকায় রাখা হয়েছে।

দেশব্যাপী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সবার জন্য ইন্টারনেট সুবিধা, সব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় ইন্টারনেট, গ্রামীণ ডিজিটাল সেন্টার, হাসপাতাল, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং বিমানবন্দরে ফ্রি ইন্টারন্টে সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভাষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালু, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরে বিশ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিদেশ গমনে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

চাহিদাভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষায় দেশব্যাপী টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিকায়ন, শিল্পকারখানায় সরাসরি ট্রেনিং এবং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন চালুর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনে সব কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনামূল্যে স্কিলস ডেভেলপমেন্ট, ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া ও ক্যারিয়ার সেন্টার প্রতিষ্ঠা, ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ আয়োজন করাসহ শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক তৈরির পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তায় জেলা পর্যায়ে কুটিরশিল্প ও এসএমই খাতে স্বল্পসুদে ঋণ, ই-কমার্স সম্প্রসারণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থা দলীয়করণমুক্ত ও ব্যবসাবান্ধব করা, মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ, তথ্যপ্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী শিল্পে নতুন কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ সহায়তা, ব্যবসা সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সুবিধা সম্প্রসারণ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান, মাইক্রোক্রেডিট সহায়তা, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য ন্যূনতম মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলছে, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সমন্বিত, ফলপ্রসূ ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ নিশ্চিত করতেই মন্ত্রণালয় ও বিভাগভিত্তিক এসব অগ্রাধিকার প্রকল্প ও ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি নির্ধারণ করা হচ্ছে।