দেশের অন্যতম লিচু উৎপাদন কেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ লিচু নষ্ট হচ্ছে। এতে প্রায় ২০০ থেকে ২২৫ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ছেন চাষিরা। প্রতিকূল আবহাওয়া, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিবছর এ ক্ষতির শিকার হচ্ছেন চাষিরা।

কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, লিচু গবেষণাগার ও হিমাগার স্থাপনসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে এ ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুন

লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি

চাষিদের তথ্যমতে, ঈশ্বরদীতে প্রায় ৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হয়। উৎপাদিত লিচুর বাজারমূল্য ৬০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকার মধ্যে। তবে তীব্র গরম, খরা, ঝড়-বৃষ্টি, পোকামাকড়ের আক্রমণ, অপর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণের নানা সীমাবদ্ধতায় প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ লিচু নষ্ট হয়ে যায়।

ঈশ্বরদীতে প্রতিবছর নষ্ট হয় ২২৫ কোটি টাকার লিচু

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত লিচুচাষি আব্দুল জলিল কিতাব মণ্ডল বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি পুরোনো পদ্ধতিতে লিচু সংগ্রহের কারণেও অনেক ফল নষ্ট হয়। এখনো বড় বাঁশের কোটা ব্যবহার করে গাছ থেকে লিচু সংগ্রহ করা হয়, এতে অনেক লিচু ঝরে পড়ে। উন্নত দেশের মতো আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা গেলে ক্ষতি কমবে। তিনি লিচু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলারও দাবি জানান।

আরও পড়ুন

ঈশ্বরদীতে জমজমাট লিচুর বাজার, কম দামেও খুশি চাষিরা

মানিকনগর গ্রামের চাষি মোস্তফা জামান নয়ন বলেন, লিচু সংগ্রহ মৌসুমে বৃষ্টি হলে দ্রুত পচন ধরে, আবার অতিরিক্ত রোদে ফলের চামড়া পুড়ে কালচে হয়ে যায়। ৩০ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা লিচুর জন্য সহনীয় হলেও এবার তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লিচু গাছেই নষ্ট হয়েছে।

ঈশ্বরদীতে প্রতিবছর নষ্ট হয় ২২৫ কোটি টাকার লিচু

তিনি বলেন, দ্রুত পরিবহন ও বিদেশে রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো গেলে ক্ষতি কমবে।

আরও পড়ুন

লিচু উৎসবের আমেজ ঈশ্বরদীর ঘরে ঘরে

বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ বলেন, এ বছর তীব্র তাপদাহে অনেক লিচু সংগ্রহের আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। আবার সব লিচু প্রায় ১৫ দিনের মধ্যে পেকে যাওয়ায় একসঙ্গে বাজারজাত করতে হয়। হিমাগার না থাকায় এবং পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় পরিবহন ও বিপণনের সময়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফল নষ্ট হয়।

ঈশ্বরদীতে প্রতিবছর নষ্ট হয় ২২৫ কোটি টাকার লিচু

চাষিরা জানান, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে লিচু চাষ করলে পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে এবং ফলের গুণগত মান ভালো থাকে। তবে এ বিষয়ে অধিকাংশ কৃষকের প্রশিক্ষণ নেই। স্বল্পমূল্যে ব্যাগ সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে তারা এ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।

আরও পড়ুন

রোদে পুড়ে যাচ্ছে পাকা লিচু, দাম পাচ্ছেন না চাষিরা

তাদের দাবি, ঈশ্বরদীতে একটি লিচু গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা হলে নতুন জাত উদ্ভাবন, ফলের গুণগত মান উন্নয়ন এবং উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নয়নে সহায়তা মিলবে। পাশাপাশি একটি হিমাগার স্থাপন করা হলে মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদিত লিচু সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং বাজারদরও স্থিতিশীল থাকবে।

ঈশ্বরদীতে প্রতিবছর নষ্ট হয় ২২৫ কোটি টাকার লিচু

ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মমিন বলেন, ফলন ও গুণগত মান রক্ষায় ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি কার্যকর। এছাড়া লিচু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার এবং নতুন জাত উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণাগার স্থাপন জরুরি। এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের উচ্চপর্যায়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি বছর ঈশ্বরদীতে লিচুর ভালো ফলন হলেও সংগ্রহ মৌসুমে তীব্র তাপদাহের কারণে অনেক চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

এফএ/এএসএম