জাতীয় ফল কাঁঠালের মৌসুমে ময়মনসিংহের গ্রামাঞ্চলজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ। জেলার ভালুকা, ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছা, ত্রিশাল ও গফরগাঁওয়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছে গাছে ঝুলছে পাকা কাঁঠাল। চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনে খুশি হওয়ার কথা ছিল চাষিদের। কিন্তু পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাবে সেই আনন্দ এখন পরিণত হয়েছে হতাশায়।

বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ ও দ্রুত পচনশীল হওয়ায় ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা। অনেক ক্ষেত্রে গাছেই নষ্ট হচ্ছে কাঁঠাল, আবার হাটে বিক্রি না হওয়া ফল পচে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

আমের চেয়ে বেশি খরচ ক্যারেট-পরিবহনে, বিপাকে চাষিরা

কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাল মাটির উঁচু জমি কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে ভালুকা ও ফুলবাড়িয়া উপজেলায় এবার ব্যাপক ফলন হয়েছে। শুধু ভালুকা উপজেলাতেই ৩৮৫ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। ৪৩ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি উৎপাদন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

‘ময়মনসিংহ অঞ্চলের লাল মাটির উঁচু জমি কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বিশেষ করে ভালুকা ও ফুলবাড়িয়া উপজেলায় এবার ব্যাপক ফলন হয়েছে। শুধু ভালুকা উপজেলাতেই ৩৮৫ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। ৪৩ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি উৎপাদন বলে ধারণা করা হচ্ছে’

ভালুকার সিডস্টোর বাজার, ভরাডোবা, মল্লিকবাড়ী, বিরুনীয়া, মাস্টারবাড়ী, ফুলবাড়িয়া ও মুক্তাগাছার বিভিন্ন বাজারে প্রতিদিন ভোর থেকে বসছে কাঁঠালের জমজমাট হাট। এসব হাটে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার কাঁঠাল বিক্রি হলেও সেই অর্থের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও পাইকারদের হাতে।

ময়মনসিংহে নেই প্রসেসিং সেন্টার, নষ্ট হচ্ছে কাঁঠাল

ভালুকার মেদুয়ারী এলাকার কাঁঠাল চাষি আব্দুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘এবার গাছে প্রচুর কাঁঠাল ধরেছে। কিন্তু দাম এত কম যে খরচই উঠছে না। যে কাঁঠাল ঢাকায় ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়, সেটি আমরা এখানে ৩০-৫০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি।’

আরও পড়ুন

চাকরি না পেয়ে উদ্যোক্তা হলেন নাঈম, ড্রাগনেই বাজিমাত

ফুলবাড়িয়ার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কাঁঠাল কয়েকদিনের বেশি রাখা যায় না। হিমাগার থাকলে আমরা বাজার ভালো না হলে কিছুদিন সংরক্ষণ করতে পারতাম। এখন পাইকাররা যে দাম বলে, সেই দামেই বিক্রি করতে হয়।’

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকা, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে কাঁঠাল কিনে নিয়ে যান। তবে কৃষকের হাতে সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় তারা দরকষাকষিতে সুবিধা করতে পারেন না। ফলে বাধ্য হয় কম দামেই ফল বিক্রি করে দিতে হয়।

‘কাঁচা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, পাকা কাঁঠাল থেকে জুস, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি ও স্কোয়াশ উৎপাদন এবং কাঁঠালের বীজ থেকে পুষ্টিকর আটা তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে’

কৃষিবিদদের মতে, বাংলাদেশে উৎপাদিত কাঁঠাল সংগ্রহের পর ২৫-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত অপচয় ঘটে। ময়মনসিংহেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল পাকায় বাজারে সরবরাহ বেড়ে যায়। বিক্রি না হওয়া ফল অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে যায়। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে অবিক্রিত কাঁঠাল গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করছেন।

আরও পড়ুন

লিচুর বাগানে বদলে গেছে পিরোজপুরের অর্থনীতি

মুক্তাগাছার কৃষি উদ্যোক্তা মো. মশিউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ময়মনসিংহে কাঁঠালের উৎপাদন বাড়ছে কিন্তু সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে প্রতি বছর কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। ভালুকা ও ফুলবাড়ীয়া অঞ্চলে একটি আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ কিংবা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন। এতে জাতীয় ফলের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।’

বর্তমানে ময়মনসিংহে কাঁঠাল সংরক্ষণ বা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য সরকারি কোনো প্রসেসিং সেন্টার নেই বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) সেলিনা পারভীন।

ময়মনসিংহে নেই প্রসেসিং সেন্টার, নষ্ট হচ্ছে কাঁঠাল

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ অঞ্চলে কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের সম্ভাবনা বিবেচনায় একটি প্রসেসিং সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবা হচ্ছে, যা ভালুকা এলাকায় হতে পারে।’

সেলিনা পারভীন বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতে কাঁঠাল দিয়ে জুস, চিপসসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। কাঁঠালকে শুধু মৌসুমি ফল হিসেবে না দেখে শিল্পপণ্য হিসেবে বিবেচনা করলে অপচয় অনেক কমানো সম্ভব।’

আরও পড়ুন

আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

কাঁচা কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ, পাকা কাঁঠাল থেকে জুস, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি ও স্কোয়াশ উৎপাদন এবং কাঁঠালের বীজ থেকে পুষ্টিকর আটা তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব পণ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।

অতিরিক্ত উপপরিচালক বলেন, ‘ময়মনসিংহে একটি আধুনিক কাঁঠাল প্রসেসিং সেন্টার স্থাপন করা গেলে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত কাঁঠালের ন্যায্যমূল্য পাবেন। একই সঙ্গে কাঁঠালভিত্তিক শিল্প গড়ে ওঠার মাধ্যমে এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।’

এসআর/এএসএম