ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া প্রাণঘাতী ও নজিরবিহীন তাপপ্রাবহে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বিশেষ করে মহাদেশটির পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোতে তাপমাত্রা এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে।
চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়ায় এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্র রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ইউক্রেনে জরুরি ভিত্তিতে লোডশেডিং কার্যকর করার নিদের্শ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (২৯ জুন) স্লোভাকিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর কোশিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত তুরনা নাদ বোদভোউ গ্রামে সর্বোচ্চ ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।
এদিকে চেক প্রজাতন্ত্রের আবহাওয়া দপ্তর ‘হাইড্রোমেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউট’ জানিয়েছে, রবিবার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দোকসানি এলাকায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ২০০১ সালে দেশটিতে সর্বোচ্চ ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল।
আবহাওয়া দপ্তর উল্লেখ করেছে, “পূর্বের রেকর্ড ভেঙে তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পাওয়া একেবারেই নজিরবিহীন। এই তাপপ্রবাহের স্থায়িত্বও ব্যতিক্রমী।”
হাঙ্গেরির মধ্যা অঞ্চলেও সোমবার তাপমাত্রা ৪১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা ২০০৭ সালের জুলাই মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড ৪১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের চেয়ে সামান্য কম।
প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগয়ার সোমবার সতর্ক করে বলেন, “তাপপ্রবাহের সবচেয়ে কঠিন দুটি দিন আসতে চলেছে।” সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাসা থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের অন্তত ১৩ কোটি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তীব্র গরমের মুখোমুখি হয়েছেন।
গরমের তীব্রতায় ইতালির ২২ শহরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে, ক্রোয়েশিয়ার বেশ কয়েকটি অঞ্চলেও একই সতর্কতা রয়েছে। অন্যদিকে বলকান অঞ্চলও চরম তাপপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। ক্রোয়েশিয়া, আলবেনিয়া এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় একাধিক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে।
গত সপ্তাহে পশ্চিম ইউরোপে শুরু হওয়া এই তাপপ্রবাহটি মহাদেশটিতে এ যাবৎকালের রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গত ২১ জুন থেকে এ পর্যন্ত অতিরিক্ত গরমে ১ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
পশ্চিম ইউরোপে যদিও তাপমাত্রা কিছুটা কমেছে, তবে পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়েই আরো তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। ইতালীয় বিমান বাহিনীর আবহাওয়াবিদ দানিয়েল মোচিও জানিয়েছেন, ৫ জুলাই থেকে ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাজ্যের কিছু অংশে আবার গরমের তীব্রতা বাড়তে পারে।
রবিবার (২৯ জুন) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম সতর্ক করে বলেন, “ইউরোপ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত হতে থাকা মহাদেশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ হারে উত্তপ্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত গরম বা হিট স্ট্রেসকে প্রায়শই ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়- এবং ইউরোপের ঘরবাড়ি, কর্মক্ষেত্র ও স্কুলগুলো এই ধরনের তাপমাত্রা সহ্য করার মতো করে তৈরি করা হয়নি।”
ইউক্রেনে তীব্র গরমের কারণে জরুরি লোডশেডিং কার্যকর করা হয়েছে, দেশটিতে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সংগঠন ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন’ জানিয়েছে, “এই তাপপ্রবাহটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ ঐতিহাসিকভাবে জুন মাস পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে গরম মাস নয়।”
তারা সতর্ক করে বলেন, “এই গ্রীষ্মকাল প্রমাণ করছে যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার ফলে চরম তাপমাত্রা ইতিমধ্যে আমাদের সমাজের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে।”








