একসময় যে ইউরোপ আধুনিক চিন্তার মশাল জ্বালিয়ে গোটা দুনিয়ার চিন্তার জড়তা দূর করতে চেয়েছিল, সেই ইউরোপ আজ কেন স্থবির হয়ে পড়তে চলেছে, সেটা একটু খতিয়ে দেখা যাক। ইউরোপের এ দুর্বলতার বিষয়টি আলোচনায় আসে বছর দুই আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর একটি নীতিনির্ধারণী ভাষণকে কেন্দ্র করে। সময়টা ছিল ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল, ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন : ‘আমাদের ইউরোপ আজ মুমূর্ষু। সে মারা যেতে পারে।’
তার এ বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল-ইউরোপের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে ইউরোপীয়দের নিজেদের সিদ্ধান্তের ওপর। তিনি তার এ কঠিন মন্তব্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ইউরোপ বর্তমানে সামরিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মতো গুরুতর একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যথাসময়ে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে ইউরোপ বিশ্বমঞ্চে তার প্রভাব হারাতে পারে। তিনি নিশ্চয়ই এ কথা বোঝাতে চাননি যে, ইউরোপের পতন অবশ্যম্ভাবী; বরং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তেমন পরিণতি ঘটতেও পারে।
ম্যাক্রোঁর সেই শক্তিশালী সতর্কবার্তা এবং দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ইউরোপ কি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পথে হাঁটছে? সেটাই আমরা বিচার করে দেখব।
তবে তার আগে প্রাক্কথন হিসাবে দু-একটি কথা বলে নেওয়া যাক। ইউরোপের এত জ্ঞানবিজ্ঞান, তত্ত্ব-দর্শন এবং চোখধাঁধানো উন্নয়ন সত্ত্বেও স্বনির্ভর ইউরোপ বলতে যা বোঝায়, সেই লক্ষ্য কিন্তু অর্জন করতে পারেনি। অনেক জরুরি বিষয়ে এখন পর্যন্ত নির্ভরশীল ইউরোপ। যেমন জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর তাকে নির্ভর করতে হয়। নিরাপত্তার জন্য নির্ভর করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী যায় চীন থেকে। ইউরোপের এ পরনির্ভরশীলতার ব্যাখ্যা কী? তারা যে আধুনিক জীবন দর্শন, নীতি ও মূল্যবোধ প্রচার করল, মানুষের মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মাহাত্ম্য তুলে ধরল, আজ তা রক্ষায় কেন দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না? কেন গণভোট করে যুক্তরাজ্যকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে হলো? এর কারণ যাই থাকুক, যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে অবস্থান করার ফলে ইউরোপের ক্ষমতা কিছুটা হলেও খর্ব হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যও যে খুব ভালো আছে এমন নয়। সেখানে এক দশকে ছয়জন প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এ অভাব নিশ্চয়ই হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি। এ অবস্থা সৃষ্টিতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, কোভিড-১৯-এর মহামারিজনিত অভিঘাত, ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার বিশেষ অভিযান, গাজায় হামাস নির্মূলে ইসরাইলের নির্বিচার হামলা এবং সর্বশেষ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ বিমান আক্রমণ। আজ চলমান ঘটনাপ্রবাহ বিশ্বজুড়ে এমন এক পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যা সামাল দেওয়া কেবল ইউরোপ নয়, বিশ্ব অর্থনীতির পক্ষেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার কারণে কোভিড-১৯ মহামারিতে ইউরোপের মতো উন্নত দেশগুলোয় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। পর্যটন, বিমান পরিবহণসহ অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বিপর্যয় ঘটে গেছে, যার জের এখনো বইতে হচ্ছে। এ ধাক্কা সামাল দেওয়ার জন্য আরও সময় দরকার ছিল। কিন্তু এ সময়ে রাশিয়ার আপত্তি উপেক্ষা করে ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য করতে গেলে রাশিয়া ইউক্রেনের ওপর বিশেষ সামরিক অভিযান চালায়।
ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে যে ভৌগোলিক নিরাপত্তা ভোগ করে আসছিল, ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযান সেই ধারণা ধূলিসাৎ করে দেয়। রাশিয়ার এ বিশেষ অভিযানের বিরুদ্ধে ইউরোপ সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা দূরে থাক, আমেরিকার ডাকে সাড়া দিতেও সাহস দেখায়নি। ইউক্রেনকে সাহায্য করার ব্যাপারে ইউরোপকে যথাসাধ্য সতর্কতা অবলম্বন করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হওযায় তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদির দাম বেড়েছে এবং ইউরোপের সীমিত আয়ের লোকদের জীবনযাত্রার ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। উপরন্তু ইউরোপ তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমরাস্ত্র ক্রয় খাতে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী শুল্কনীতি ইউরোপসহ অনেক দেশকে আর্থিক অসুবিধায় ফেলে দিয়েছে। তবে সবকিছুর আড়ালে চলে যায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথভাবে ইরান আক্রমণে। এ আক্রমণে ইরানের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তারা যে জবাব দিয়েছে, তাও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালিকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে পরিস্থিতিকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বিশেষ সক্ষমতা দেখিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং বিশ্ব অর্থনীতির নাভিশ্বাস ওঠে।
যে ইউরোপ একদা এশিয়া, আফ্রিকায় উপনিবেশিক শক্তি হিসাবে দাপটের সঙ্গে শাসন-শোষণ চালিয়েছে, সেই ইউরোপের আজ ত্রাহী মধুসূদন অবস্থা! এ সম্মেলনের এক বছর আগে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান মারিও দ্রাঘিওর একটি তথ্যকে আমরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করতে পারি। এ তথ্যটি হচ্ছে, প্রতিবছর প্রায় ২৮ বিলিয়ন ইউরো অর্থাৎ প্রায় ৯২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ ঘাটতি রয়েছে ইউরোপের। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষণ নীতির চাপ বেড়েছে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকি আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। এরকম বাস্তবতায় ইউরোপ ধীরে চলার নীতি অনুসরণ করলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, কোপেনহেগেন সহযোগিতা সম্মেলনে যে ২৮টি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে এয়ারবাস, সিমেন্স, থ্যালেস, এসএপি, সাব ও নভো নরডিক্সের মতো কোম্পানি উল্লেখযোগ্য। তারা ২০৩০ সালের মধ্যে গড়ে ৫০ ভাগ বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু শর্ত দিয়েছিল প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। কারণ, বিনিয়োগ ফলপ্রসূ করতে হলে দরকার সহজ নিয়মকানুন, দ্রুত অনুমোদন লাভের ব্যবস্থা, সুলভ জ্বালানি, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং একটি কার্যকর অভ্যন্তরীণ বাজার। এ শর্ত পূরণে বিলম্বের কারণে আলোচিত ৩৫টি প্রস্তাবের মধ্যে মাত্র ৪টি গৃহীত হয়, ২১টি প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ে থাকে। নিয়মকানুন সহজ না হলে, খরচ কমাতে না পারলে কোথাও কোনো কোম্পানি পুঁজি বিনিয়োগ করে না। এজন্য রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং নীতিগত অবস্থানের মধ্যে ফাঁক থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।
ইউরোপকে এ গল্প শোনানো আর মায়ের কাছে মাসির গল্প বলা এক কথা। আর যাই হোক, নীতি আর পরিকল্পনার অভাবে ভুগছে না ইউরোপ, কিন্তু ভুগছে বাস্তবায়নের দুর্বলতায়। অভিজ্ঞজনদের অভিমত হচ্ছে, ইউরোপীয় পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন আর তেমন কার্যকর ও শক্তিশালী নয়। কারণ, ইউরোপীয় পণ্যের একটা মান রয়েছে, যা ঠিক রেখে উৎপাদন ব্যয় ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা সত্যিই অসম্ভব। আর এর সুযোগ নিচ্ছে চীন। ব্যক্তি পুঁজির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পুঁজির এ এক অসম প্রতিযোগিতা। ইউরোপের অর্থনীতির পণ্ডিতরা এ বিষয়ে কি ভাবছেন? নিশ্চয়ই সামরিক শক্তি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে না।
সৈয়দ তোশারফ আলী : সিনিয়র সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক








