লাকমিনা জেসমিন সোমা, পর্তুগাল

আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসে আছে- ‘কোনোভাবে উন্নত দেশের মাটিতে পা রাখতে পারলেই রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া যায়।’ কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি এবং সেসব দেশের অভিবাসন আইনের কঠোর বাস্তবতার সঙ্গে এই ধারণার বিন্দুমাত্র মিল নেই।

না জেনে কিংবা দালের চটকদার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে এই মরীচিকার পেছনে ছুটে প্রতি বছর হাজার হাজার তরুণ তাদের জীবন, অর্থ ও ভবিষ্যৎ বিপন্ন করছেন। আজ এই অবাস্তব মোহের পেছনের কঠিন সত্যটি উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি।

আন্তর্জাতিক আইনি ও নীতিগত দৃষ্টিতে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি ‘নিরাপদ উৎস দেশ’ হিসেবে বিবেচিত। এর সহজ অর্থ হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ এখন এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে নাগরিকদের জন্য ঢালাও কোনো যুদ্ধবিগ্রহ বা মানবিক বিপর্যয় নেই এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের সাধারণ নিরাপত্তা দিতে সক্ষম।

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে, কোনো নাগরিক কখনোই সেখানে আশ্রয় পাবেন না। তবে কেবল দেশের দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার দিন শেষ। শুধু অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বা উন্নত জীবনের খোঁজে সুদূর প্রবাসে গিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করলে তা মঞ্জুর হওয়ার সম্ভাবনা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের সবচেয়ে বড় ভুলটি হয় রাজনৈতিক আশ্রয়কে চাকরি বা সাধারণ অভিবাসনের একটি সহজ বিকল্প পথ মনে করার মাধ্যমে। এটি কোনো কর্মসংস্থান বা বৈধ প্রবেশপত্রের সংক্ষিপ্ত পথ নয়; এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া।

সুরক্ষার অধিকার: এটি শুধুমাত্র তাদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত, যারা নিজ দেশে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত নির্যাতন, চরম নিপীড়ন কিংবা জীবননাশের সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর ঝুঁকির মুখোমুখি।

অকাট্য প্রমাণ সাপেক্ষ: এখানে প্রতিটি আবেদন অত্যন্ত কঠোরভাবে, ব্যক্তিগত নথিপত্র, বাস্তব প্রমাণ এবং উদ্ভূত পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়। কোনো রকম অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কেবল মৌখিক কথার ওপর ভিত্তি করে কোনো দেশ এখন আর কাউকে সুরক্ষার সনদ দেয় না।

তাই যারা এখনো ভাবছেন, ‘যে কোনো উপায়ে বা অবৈধ পথে দূর দেশে পৌঁছাতে পারলেই জীবন পার’ তারা আসলে একটি মারাত্মক ভুল ধারণার মধ্যে বাস করছেন। বছরের পর বছর আটক কেন্দ্রে থাকা কিংবা আইনি লড়াইয়ের পর যখন আবেদনটি চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যায়, তখন সেই ক্ষতি আর কোনোভাবেই পুষিয়ে নেওয়া যায় না।

বিদেশে আসার স্বপ্ন দেখা বা নিজের ভাগ্য বদলাতে চাওয়া মোটেও অন্যায় নয়, তবে সেই পরিকল্পনাটি হতে হবে সম্পূর্ণ বৈধ ও আইনসম্মত। একটি ভুল সিদ্ধান্ত শুধু আপনার মূল্যবান সময় আর পরিবারের সারাজীবনের জমানো অর্থই ধ্বংস করে না, বরং আপনার ভবিষ্যতের সমস্ত বৈধ উপায়ে যাওয়ার সুযোগও চিরকালের জন্য ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।

আবেগ বা গুজবের বশে চোরাপথ না খুঁজে, সঠিক তথ্যের ওপর ভরসা রাখা উচিত। নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে বৈধ উপায়ে বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা করে নেওয়াই একজন সচেতন নাগরিকের আসল পরিচয়। দালালের পকেট ভারী না করে নিজের যোগ্যতা ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই এখন সময়ের দাবি।

এমআরএম