এমকে হক, জার্মানি
আমাদের সমাজে একটা বড় অংশ প্রবাসীদের দিকে প্রায়ই নোংরা আঙুল তোলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বাস্তব জীবনেও একটি সস্তা ডায়ালগ প্রায়ই শোনা যায়- ‘টাকার লোভে বিদেশে গিয়ে মা-বাবা, ফ্যামিলিকে ভুলে গেছিস, তোরা পর হয়ে গেছিস!’
ফেসবুকের পাতায় স্ক্রল করতে করতে যখন এমন সস্তা ট্রোল আর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল চোখে পড়ে, তখন আর চুপ থাকা যায় না। আজ এই কপটতার মুখোশটা উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি।
যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে প্রবাসীদের খুব সহজে ‘পর’ বলে রায় দিয়ে দেন, তারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন- একটি তরুণ বা তরুণী কেন নিজের চেনা শহর, শৈশবের মানুষ আর মায়ের হাতের রান্না ছেড়ে হাজার মাইল দূরে জার্মানির হাড়কাঁপানো শীত কিংবা মরুর বুকে গিয়ে পড়ে থাকে?
বাস্তবতা হলো, দেশে যখন একজন তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে বছরের পর বছর বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে ঘোরে, তখন এই সমাজই তাকে ‘নর্দমার কীট’ বা অপদার্থ বানিয়ে দেয়। তখন কাছের আত্মীয়-স্বজন বা সমাজের মানুষগুলোই তাকে চড়-থাপ্পড়ের মতো খোঁটা দিতে ছাড়ে না। তখন তো এই সমাজ তাকে আপন করে বুকে টেনে নেয় না! তবে আজ প্রবাসে গিয়ে যখন সে নিজের ভাগ্য বদলাবার চেষ্টা করছে, তখন কেন এই কৃত্রিম পরনিন্দা?
আরও পড়ুন
জার্মানির একাকীত্বই আমার কাছে সেরা
প্রবাসীরা নিজেদের কমফোর্ট জোন আর প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়েছেন এক বুক স্বপ্ন আর দায়িত্ববোধ নিয়ে। উদ্দেশ্য একটাই- মাস শেষে যেন দেশের ফ্যামিলির মুখে হাসি ফোটানো যায়, বৃদ্ধ মা-বাবার চিকিৎসার খরচটা সময়মতো পাঠানো যায়, আর ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা যায়।
নিজের পুরো লাইফস্টাইল, যৌবন আর সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে যারা দেশের পরিবারগুলোকে শক্ত অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড উপহার দিচ্ছে- তাদের ‘পর’ ভাবার চেয়ে বড় মানসিক দেউলিয়াত্ব আর হতে পারে না।
প্রবাসীরা কেবল টাকার পেছনে ছোটেন না; তারা ছোটেন একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ আর মানসিক শান্তির খোঁজে- যা আমাদের দেশের বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনেক সময়ই তাদের দিতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রবাসে নিজের সব কাজ নিজে হাতে করে, দিনরাত রক্ত জল করা উপার্জনে যারা দেশের চাকা সচল রাখছেন, তারাই প্রকৃত অর্থে আমাদের দেশের আসল হিরো।
দূর থেকে বসে কাউকে জাজ করা কিংবা সমালোচনা করা খুব সহজ, কিন্তু প্রবাসীদের এই নীরব ত্যাগ ও ভেতরের রক্তক্ষরণ বুঝতে হলে বিশাল একটা কলিজা লাগে। তাই যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সস্তা ট্রোল নিয়ে ব্যস্ত, তারা তা-ই করতে থাকুন।
আর যারা বাস্তববাদী, যারা নিজেদের ও পরিবারের ভাগ্য সত্যি বদলাতে চান-তারা এই সব ফালতু কথায় কান না দিয়ে নিজের দক্ষতা উন্নয়ন ও সঠিক প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিন। দিনশেষে আপনার লড়াইটা আপনাকেই লড়তে হবে, সমাজ কেবল তালি দেবে কিংবা আঙুল তুলবে।
এমআরএম








