টানা ৯ দিন তীব্র আগুনের হল্কায় পুড়ছে ইউরোপ। ২০ জুন শুরু হওয়া শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ এই তাপপ্রবাহে ইতোমধ্যেই মহাদেশটিতে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ৪০ ডিগ্রি ছাড়ানো পারদের নিচে এসে থমকে গেছে জনজীবন, বিকল হয়ে পড়েছে বিদ্যুৎ গ্রিড ও যোগাযোগব্যবস্থা। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, তাপপ্রবাহটি এখন পশ্চিম ইউরোপ থেকে আরও পূর্বে বলকান অঞ্চলের দিকে সরছে। তবে চলমান এই নরকযন্ত্রণা এখনই শেষ হচ্ছে না; আবহাওয়া কিছুটা ঠান্ডা হলেও এর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতিকর প্রভাব আরও অন্তত ১০ দিন পর্যন্ত ভোগাবে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সোমবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য।

শনিবার রাতে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামসহ কিছু এলাকায় আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টি সাময়িক স্বস্তি দিলেও মহাদেশটির কোটি কোটি মানুষ এখনো তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করছেন। মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে গরমের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ডে তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপের প্রায় ১৯ কোটি ১০ লাখ মানুষের রোববার ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপর তাপমাত্রা সহ্য করতে হয়েছে। জার্মান আবহাওয়া অধিদপ্তর ও জনসংখ্যার ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইউরোপের প্রায় ৩৮ কোটি ১০ লাখ মানুষের এলাকার তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করেছে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি ও চেক প্রজাতন্ত্রের প্রায় সব অংশেই তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রয়েছে। পাশাপাশি জার্মানির ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষসহ স্লোভাকিয়া, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, ইতালি, অস্ট্রিয়া এবং ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দারাও চরম এই দাবদাহের মুখোমুখি হয়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়ুসাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, ‘এই মুহূর্তে বিশ্বের ১৫ কোটি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করছেন। শতশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এককালে যা ‘এক প্রজন্মের মধ্যে একবার’ ঘটত, সেই তাপপ্রবাহ এখন প্রায় প্রতিবছরই দেখা দিচ্ছে। অথচ ইউরোপের ঘরবাড়ি, কর্মক্ষেত্র ও বিদ্যালয়গুলো এই চরম পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য উপযুক্ত নয়। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া এই তাপপ্রবাহ ‘প্রায় অসম্ভব’ ছিল। ২০ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে রাতের তাপমাত্রা এত বেশি হওয়ার আশঙ্কা এখন ১০০ গুণ বেড়ে গেছে। ২০০৩ সালের ভয়াবহ তাপপ্রবাহের স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে ফ্রান্সকে। শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ সেই তাপপ্রবাহে দেশটিতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এবারও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা করছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। ফ্রান্সের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা রোববার জানিয়েছে, মৃতদের বেশির ভাগের বয়সই ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সি।

তবে ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ত আশ্বস্ত করে বলেছেন, বৃদ্ধাশ্রম ও সেবাকেন্দ্রগুলোতে আগের চেয়ে ভালো প্রস্তুতি থাকায় ২০০৩ সালের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি ‘সম্ভবত’ এড়ানো যাবে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরেন নুনেস সরকারের সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘এটি কোনো বিপর্যয় বা ব্যর্থতা নয়, আমরা প্রস্তুত ছিলাম।’ স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবশ্য সতর্ক করেছেন যে, আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার পরও আরও ১০ দিন পর্যন্ত এই তাপপ্রবাহের প্রভাব থেকে যেতে পারে। চরম এই গরমে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জার্মানিতে উত্তর রাইন-ভেস্টফালিয়া রাজ্যের একটি প্রধান রেললাইনে ট্রেন চলাচল কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং লাইপজিগ শহরে ট্রাম চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ সূর্য ডোবার আগে ঘরের বাইরে বের হতে চাচ্ছেন না। ইতালির রোমে তীব্র গরমের মধ্যেও সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে রোববারের প্রার্থনায় অংশ নেওয়ায় ভক্তদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন পোপ লিও। তীব্র গরমে ইউরোপের নদীগুলোর পানি শুকিয়ে উষ্ণ হয়ে উঠছে, যা কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংকট তৈরি করেছে। হাঙ্গেরির পাকস পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি শীতলীকরণের জন্য দানিউব নদীর পানি ব্যবহার করে। কিন্তু নদীর পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ায় রোববার আবারও বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে।