ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও সামনে এসেছে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের সক্রিয়তার চাঞ্চল্যকর চিত্র। সম্প্রতি একটি গোপন কোড বা সংকেতের গরমিলেই ভেস্তে গেছে ৭৬ বাংলাদেশিকে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা। বোর্ডিং গেটে নির্ধারিত কোড বলতে না পারা, ভিসা ও পাসপোর্টে অসংগতি এবং গোয়েন্দাদের আগাম নজরদারির কারণে পুরো সিন্ডিকেটের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে চলে আসে।

ওই ঘটনার পর বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), সিভিল এভিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ইউনিট যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে বিমানবন্দরের ভেতরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততার অভিযোগও গুরুত্ব পাচ্ছে।

আরও পড়ুন

এয়ার অ্যাস্ট্রার ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি, শাহজালালে জরুরি অবতরণ

তবে ওই ঘটনার পর এখনো টনক নড়েনি রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী উড়োজাহাজ সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের। অভিযোগ রয়েছে, ৭৬ বাংলাদেশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মালয়েশিয়াগামী ফ্লাইটের টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু জাল ভিসায় কীভাবে ৭৬ ব্যক্তি বোর্ডিং কার্ড পেলেন, কোন ট্রাভেলস এজেন্সি একসঙ্গে এত সংখ্যক জাল ভিসার যাত্রীর টিকিট কাটলেন, তা তদন্ত করছে না সংস্থাটি। এ কারণে অংশীজনদের অনেকেই মনে করছেন, মানবপাচার চক্রের সঙ্গে বিমানের সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রভাবশালী কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন।

গোপন কোডেই চলতো পুরো অপারেশন

শাহজালাল বিমানবন্দর সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্দিষ্ট গোপন সংকেত বা কোড ব্যবহার করে যাত্রীদের বিমানবন্দরের বিভিন্ন নিরাপত্তা স্তর পার করিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে আসছিল। নির্দিষ্ট কোড জানা থাকলেই সংশ্লিষ্ট দালালচক্রের সদস্যরা বুঝে যেতেন কোন যাত্রীকে কোন কাউন্টার, কোন ইমিগ্রেশন ডেস্ক কিংবা কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে দ্রুত ছাড়িয়ে দিতে হবে।

সর্বশেষ গত শনিবার (৪ জুলাই) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটে ব্যবহৃত কোড ছিল ‘শাপলা’। কিন্তু বোর্ডিং গেটে পৌঁছে কয়েকজন যাত্রী সেই কোড বলতে ব্যর্থ হন। তখনই অন্য দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সন্দেহ হয় এবং তাদের কাগজপত্র পুনরায় যাচাই করা শুরু হয়। এরপরই বেরিয়ে আসে পাসপোর্ট ও ভিসার একাধিক অসংগতি।

আরও পড়ুন

নেপালের বোর্ডিং পাসে ইতালির ফ্লাইটে পাচার: বিমানের কর্মকর্তা গ্রেফতার

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, প্রথমে ওই ফ্লাইটের পাঁচ যাত্রীকে বোর্ডিং গেটে থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা নির্ধারিত কোড বলতে না পারায় এবং ভিসা সংক্রান্ত তথ্যের অসংগতি ধরা পড়ায় পুরো বিষয়টি গোয়েন্দাদের নজরে আসে।

খবরটি মুহূর্তে একই সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যদের কাছে পৌঁছে যায়। আতঙ্কে আরও ১০ যাত্রী দ্রুত বিমানবন্দর ত্যাগের চেষ্টা করেন। তবে গোয়েন্দা নজরদারির কারণে তাদেরও শনাক্ত করা হয়। তখন চেক-ইন কাউন্টারে অপেক্ষমাণ আরও ৬১ যাত্রী পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বোর্ডিং পাস না নিয়েই বিমানবন্দর ছেড়ে চলে যান। পুরো ঘটনায় কিছু সময়ের জন্য বিমানবন্দরে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

আগে থেকেই ছিল গোয়েন্দাদের নজরদারি

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সূত্র জানায়, বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটে মোট ২৮৮ জন যাত্রীর টিকিট ছিল। এর মধ্যে—ইমিগ্রেশন বিভাগ ১০ জনকে অফলোড করে।

বোর্ডিং গেটে আরও পাঁচজনকে আটকে দেওয়া হয়। বোর্ডিং পাস নেওয়ার পরও ৬১ যাত্রী আর বোর্ডিং গেটে ফিরে আসেননি। পরে ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে ২১২ জন যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে উড্ডয়ন করে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারটি।

আরও পড়ুন

বিমানবন্দর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান, আটক ৮২

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছিল। পরে যাত্রীদের পাসপোর্ট ও ভিসা পুনরায় যাচাইয়ের সময় একের পর এক অসংগতি ধরা পড়তে শুরু করে। তারা প্রত্যেকে ট্যুরিস্ট জাল ভিসায় মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। সেখানে পৌঁছে অবৈধভাবে থেকে যাওয়া এবং পরে কাজ নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

টনক নড়েনি বিমানের

বিগত সময়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে মানবপাচারের যে কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটেছিল, তার প্রায় সব কটির সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম উঠে এসেছিল। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর “বিমান বাংলাদেশ: ‘বডি কন্ট্রাক্টে’ মানবপাচার, গোয়েন্দা তথ্যে দুই কর্মকর্তার নাম শিরোনামে জাগো নিউজে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল।

কিন্তু গত শনিবারের ঘটনার পর এখন পর্যন্ত টনক নড়েনি বিমানের। কোন ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ওই ৭৬ ব্যক্তি মালয়েশিয়াগামী বিমানের টিকিট কেটেছিলেন, তা এখনো অজানা। এ নিয়ে বিমানের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কারও কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘৭৬ জন ওই দিন সন্ধ্যায় বিমানবন্দরে ঢুকে বিমানের নির্দিষ্ট ডেস্ক থেকে বোর্ডিং কার্ড সংগ্রহ করেন। জাল ভিসায় কীভাবে তারা কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বোর্ডিং কার্ড পেলেন, তা নিয়ে প্রথম প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, এ ডেস্কেই প্রাথমিকভাবে যাত্রীদের ভিসা বৈধ কি না তা পরীক্ষা করা হয়।’

আরও পড়ুন

শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

জানতে চাইলে বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বিমান থেকে যে ট্রাভেল এজেন্সি টিকিটগুলো কেটেছিল ওই প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করবে বিমানের বিক্রয় ও বিপণন বিভাগ।

কিন্তু কবে নাগাদ এ তালিকা তৈরি করা হবে, কোন ট্রাভেল এজেন্সি এসব টিকিট কেটেছিল তার নাম-ঠিকানা, বিমানবন্দরে যে কাউন্টার থেকে ওই ৭৬ জনকে বোর্ডিং কার্ড দেওয়া হয়েছিল তার কিছুই জানা নেই তার।

কীভাবে পার হলো এতগুলো নিরাপত্তা স্তর?

ওই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিসায় গুরুতর অসংগতি থাকার পরও কীভাবে এতগুলো যাত্রী নির্বিঘ্নে চেক-ইন, ইমিগ্রেশন এবং নিরাপত্তার একাধিক ধাপ অতিক্রম করলেন?

তদন্তকারীদের ধারণা, বিমানবন্দরের ভেতরে কর্মরত অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী—চেক-ইন কাউন্টারে যথাযথ যাচাই ছাড়াই ভিসা গ্রহণ করা হয়। ইমিগ্রেশন থেকেও বিদেশযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে বোর্ডিং গেটে গিয়ে শেষ পর্যায়ের যাচাইয়ে অসংগতি ধরা পড়ে।

আরও পড়ুন

সংসদে মন্ত্রী / শাহজালাল বিমানবন্দর জিয়ার নামে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত হয়নি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্র ‘বডি কন্ট্রাক্টের’ মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে জাল, ত্রুটিপূর্ণ বা সন্দেহজনক কাগজপত্রধারী ব্যক্তিদের বিমানবন্দরের বিভিন্ন নিরাপত্তা ধাপ পার করিয়ে বিদেশে পাঠায়। এই প্রক্রিয়ায় বিমানবন্দরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, ট্রাভেল এজেন্ট, দালাল এবং বিদেশভিত্তিক সিন্ডিকেট একসঙ্গে কাজ করে। এজন্য সিন্ডিকেট সদস্যরা ‘উত্তরা’, ‘সিলেট’, ‘চশমা’, ‘একাশি’, ‘নদী’, ‘শাপলা’ ও ‘বিমান’সহ বিভিন্ন কোড ব্যবহার করেন। এই কোডের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হতো—কোন কাউন্টারে যেতে হবে, কে ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করবেন, কে আইএনএস যাচাই করবেন, কে এক্সিট গেট পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন।

শাহজালাল বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট কার্যত সীমিত। এ অবস্থায় মানবপাচারকারী চক্র ট্যুরিস্ট ভিসাকে বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও মানবপাচার করে। এভাবে গত ছয় মাসে বিভিন্ন দেশ থেকে ২২ হাজার ৩৭২ জন বাংলাদেশিকে বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ৭২৮ জন বাংলাদেশি ডিপার্টেড হয়ে দেশে ফিরেছেন। তাদের একটি বড় অংশ মানবপাচারকারী চক্রের মাধ্যমে বিদেশে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে গত ৩০ মার্চ এক অভিযানে সিভিল এভিয়েশনের অ্যারোড্রোম অপারেটর আবদুল বারী মোল্লাকে আটক করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিমানবন্দরে ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ভিত্তিক মানবপাচার সিন্ডিকেটের অন্যতম মূলহোতা আবদুল বারী মোল্লা। সরকারি চাকরির আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন

আজ থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরের চারপাশ ‘নীরব এলাকা’: ডিএনসিসি প্রশাসক

এ বিষয়ে জানতে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদের মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ওই জালিয়াত চক্রকে শনাক্তে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না তা জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি জাগো নিউজকে গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা বলেন।

পরে একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্তে কাজ করছে। আশা করি চক্রের সদস্যদের ধরতে পারবো।

তিনি বলেন, মানবপাচার বন্ধ না হলে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি এয়ারলাইন্স ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থাও কমে যেতে পারে। তাই জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার করা জরুরি।

এমএমএ/এমআইএইচএস/ এমএফএ