দেশে জাল মুদ্রা প্রস্তুত, কেনাবেচা, ব্যবহার, মজুত ও পাচারসহ এ-সংক্রান্ত অন্যান্য অপরাধ দমনে স্বতন্ত্র আইন করতে যাচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে।

প্রস্তাবিত আইনে জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্জিত সম্পদের অর্থমূল্যের দ্বিগুণ বা ন্যূনতম এক কোটি টাকা, যেটি বেশি তা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডকে পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার বিধান থাকছে।

দেশে প্রচলিত মুদ্রার আদলে জাল মুদ্রা প্রস্তুত, ধারণ, কেনাবেচা, ব্যবহার, মজুত, পরিবহন, সরবরাহ ও সহায়তাসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তি পুনর্নির্ধারণ এবং বৈধ মুদ্রা ব্যবহারে আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই নতুন আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

খসড়ায় বলা হয়েছে, জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু থাকলেও এই আইনের বিধানই প্রাধান্য পাবে। অন্য আইনের কোনো বিধান যদি এ আইনের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অংশ অকার্যকর বলে গণ্য হবে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি দেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ জাল নোট ছড়িয়ে পড়লে তা অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি। এতে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। তাই জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণে আইন কঠোর হওয়া উচিত। তবে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।

হচ্ছে আইন: জাল মুদ্রা রাখলে যাবজ্জীবন, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারফেসবুকে প্রকাশ্যে চলে জাল নোটের বেচাকেনা/ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে কমিটি ও তথ্যভান্ডার

আইনের খসড়া অনুযায়ী, জাল মুদ্রা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ সংক্রান্ত কমিটি’ গঠন করা হবে। কমিটির গঠন ও কার্যাবলি প্রবিধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক জাল মুদ্রার বাহক, সরবরাহকারী, প্রস্তুতকারী, বিপণনকারী ও মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ-সংক্রান্ত একটি তথ্যভান্ডার স্থাপন ও পরিচালনা করবে। আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত বা মামলার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংককে সরবরাহ করবে। এসব তথ্য নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কমিটিকে সরবরাহ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নির্ধারিত পদ্ধতিতে এসব তথ্য ব্যবহার করতে পারবে।

যেসব কাজ বিবেচিত হবে অপরাধ

খসড়ায় জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত একাধিক কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- মুদ্রা জাল করা বা জাল করার প্রক্রিয়ার যে কোনো অংশে অংশগ্রহণ এবং জাল মুদ্রা জেনেশুনে মজুত, কেনাবেচা, ব্যবহার, গ্রহণ বা আসল মুদ্রা হিসেবে লেনদেন করা।

এছাড়া জাল মুদ্রা তৈরির উদ্দেশ্যে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল বা উপকরণ প্রস্তুত, কেনাবেচা, ব্যবহার, সরবরাহ, আমদানি-রপ্তানি, বহন বা দখলে রাখা। জাল মুদ্রা তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন বা সেই তথ্য আদান-প্রদান এবং এ-সংক্রান্ত ফাইল, অডিও, ভিডিও, সফটকপি, হার্ডকপি বা সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি অবৈধ উদ্দেশ্যে সংরক্ষণও অপরাধ বলে গণ্য হবে।

সেই সঙ্গে অপরাধ হবে- বিদেশ থেকে দেশে বা দেশ থেকে বিদেশে জাল মুদ্রা সরবরাহ, পরিবহন বা পাচার। ব্লিচড, টেম্পার্ড ও মিসম্যাচড মুদ্রা কেনাবেচা, ব্যবহার, লেনদেন বা দখলে রাখা। এমন মুদ্রাসদৃশ বস্তু বা দলিল তৈরি করা, যা জাল করার উদ্দেশ্যে না হলেও অন্য কাউকে প্রতারিত করতে পারে।

শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জাল মুদ্রা প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও তৎপরতা বজায় রাখতে হবে। সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।- সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান

পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেফতার

খসড়া অনুযায়ী, পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ল্যান্স নায়েক বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা ও কোস্ট গার্ডের পেটি অফিসার বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা যৌক্তিক সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো স্থানে পরোয়ানা ছাড়াই প্রবেশ, পরিদর্শন ও তল্লাশি চালাতে পারবেন।

তল্লাশির সময় জাল মুদ্রা প্রস্তুত, মজুত, বিপণন বা পরিবহনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতার করা যাবে। একই সঙ্গে জাল মুদ্রা, এগুলো লেনদেন থেকে পাওয়া বৈধ দেশি-বিদেশি মুদ্রা, চেকবই, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, কম্পিউটার, স্ক্যানার, ইলেকট্রনিক ডিভাইস, কাগজ, কালি, রাসায়নিক দ্রব্যসহ সংশ্লিষ্ট উপকরণ জব্দ করা যাবে। পুলিশ ছাড়া অন্য কোনো সংস্থা গ্রেফতার বা জব্দ করলে তা দ্রুত সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করতে হবে।

কারা মামলা করতে পারবেন

জাল মুদ্রা-সংক্রান্ত অপরাধে পুলিশ, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠান বা তার প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থানায় বা আদালতে অভিযোগ বা মামলা করতে পারবেন বলে খসড়ায় বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

জাল টাকা : অর্থনীতির এক ‘নীরব ঘাতক’

২০-৫০-১০০ টাকার নোটও জাল, পাইকারি বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে

তদন্তে নির্ধারিত সময়সীমা

আইনে বলা হয়েছে, উপ-পরিদর্শক বা তদূর্ধ্ব পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা সরকার থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তদন্ত করবেন। হাতেনাতে গ্রেফতার হলে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে হবে। তা না হলে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া বা তদন্তের আদেশ পাওয়ার পর ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে। যুক্তিসংগত কারণে সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হলে আদালতের অনুমোদন নিয়ে অতিরিক্ত ৩০ কার্যদিবস সময় পাওয়া যাবে। বিশেষ ক্ষেত্রে আদালত আরও প্রয়োজনীয় সময় বাড়াতে পারবেন। নারাজি আবেদন হলে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে অধিকতর তদন্ত শেষ করতে হবে।

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ না করতে পারলে দায়ী তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অদক্ষতা ও অসদাচরণের অভিযোগ বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে (এসিআর) লিপিবদ্ধ হবে এবং প্রয়োজন হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

আদালত তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে কোনো ব্যক্তিকে আসামির পরিবর্তে সাক্ষী হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দিতে পারবেন। আবার গাফিলতি, আলামত গোপন বা কাউকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তা বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রয়োজন হলে আদালত নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশও দিতে পারবেন এবং তদন্ত চলাকালে প্রশাসনিক আদেশে তদন্তকারী কর্মকর্তার বদলি কার্যকর করা যাবে না।

হচ্ছে আইন: জাল মুদ্রা রাখলে যাবজ্জীবন, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারভাড়া বাসা নিয়ে এভাবেই চলে জাল নোট তৈরি

জাল মুদ্রা শনাক্তে কারা মতামত দেবেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার বা তার প্রতিনিধি, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক ল্যাবের বিশেষজ্ঞ ও সরকার নির্ধারিত অন্য কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জব্দ করা মুদ্রা জাল কি না, সে বিষয়ে প্রত্যয়ন ও মতামত দিতে পারবে। প্রত্যয়নকারী কর্মকর্তাকে কোন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মুদ্রাকে জাল বা আসল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা মতামতে উল্লেখ করতে হবে।

ভিডিও, অডিও ও ডিজিটাল তথ্য হবে সাক্ষ্য

জাল মুদ্রা প্রস্তুত, ধারণ, মজুত, বহন, কেনাবেচা, ব্যবহার বা সরবরাহ-সংক্রান্ত কোনো ঘটনার ভিডিও, স্থিরচিত্র, অডিও, ফোনালাপ, ইমেইল, ইন্টারনেট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ করা তথ্য আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আইনের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বাজেয়াপ্ত ও নিষ্পত্তি

বাজেয়াপ্ত দ্রব্য সরকার বা আদালত মনোনীত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তিনি বিধি অনুযায়ী তা আলামত হিসেবে ব্যবহার, হস্তান্তর, নিলাম বা অন্যভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করবেন। জব্দ হওয়া বৈধ দেশি বা বিদেশি মুদ্রা সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। ব্যাংকে জাল মুদ্রা পাওয়া গেলে কী করণীয় হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধানে নির্ধারিত হবে।

জাল মুদ্রার ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক। এর সঙ্গে প্রায়ই কালোবাজারি, অর্থপাচার, এমনকি মানবপাচারের মতো আরও বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের যোগসূত্র থাকে। ফলে এ অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান 

সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন

খসড়ায় শাস্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপরাধ থেকে অর্জিত সম্পদের দ্বিগুণ অর্থমূল্য বা এক কোটি টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ অর্থদণ্ড হবে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হবে।

জ্ঞাতসারে জাল মুদ্রা অথবা আসল মুদ্রা সম্পর্কিত কোনো গুজব ছড়ানো হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত দুই বছরের কারাদণ্ড হবে।

জাল করার উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে মুদ্রাসদৃশ কোনো বস্তু বা দলিল প্রস্তুত, যা দ্বারা কোনো ব্যক্তি প্রতারিত হতে পারে, এমন অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড ও অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত দুই মাসের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন

কর্মী নিয়োগ দিয়ে দিনরাত ছাপানো হচ্ছিল জাল টাকা, গ্রেফতার ৩

বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা / অনলাইনে ‘অস্ত্র বিক্রি’, হোম ডেলিভারি দেওয়ার প্রলোভন

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, কেউ যদি এ আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন এবং সেই সহায়তায় অপরাধ সংঘটিত হয় বা অপরাধের চেষ্টা করা হয়, তাহলে মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত একই দণ্ডে সহায়তাকারীও দণ্ডিত হবেন।

জামিন, বিচার ও আপিলের সুযোগ

খসড়া অনুযায়ী, এ আইনের অধীন সব অপরাধ হবে আমলযোগ্য, অ-আপসযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য। মামলার বিচার করবেন দায়রা জজ আদালত, অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত অথবা অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। আইনে ভিন্ন কিছু না থাকলে গ্রেফতার, তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ, বিচার ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান প্রযোজ্য হবে।

বিচারিক আদালতের রায়ে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রায় বা দণ্ডাদেশ ঘোষণার তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবেন।

হচ্ছে আইন: জাল মুদ্রা রাখলে যাবজ্জীবন, পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেফতারআইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সময় জব্দ করছে জাল নোট/ফাইল ছবি

উপকরণ নিয়ন্ত্রণ এবং বিধি-প্রবিধান জারি

খসড়ায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শক্রমে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাল মুদ্রা তৈরিতে ব্যবহৃত কাগজ, রাসায়নিক দ্রব্য, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য উপকরণের উৎপাদন, সংরক্ষণ, কেনাবেচা, সরবরাহ ও আমদানি-রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারবে।

এছাড়া সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন করতে পারবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ও বিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রবিধান জারি করতে পারবে। একই সঙ্গে আইনের একটি নির্ভরযোগ্য ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের কথাও বলা হয়েছে। তবে বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠই প্রাধান্য পাবে।

আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার আহ্বান

যোগাযোগ করা হলে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, জাল মুদ্রা একটি দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুতর হুমকি। বিপুল পরিমাণ জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে সক্ষম। তাই জাল মুদ্রা তৈরি, বহন ও প্রচারের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন সময়োপযোগী ও যৌক্তিক উদ্যোগ।

তবে তিনি মত দেন, শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না, এর কার্যকর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে জাল মুদ্রা প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও তৎপরতা বজায় রাখতে হবে। সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর নজরদারির মাধ্যমেই এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জাল মুদ্রার মতো অপরাধ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। তাই নতুন আইনে শাস্তি কঠোর করার উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন এবং আশা প্রকাশ করেন, সরকার এর গুরুত্ব অনুধাবন করে আইনটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে।

আরও পড়ুন

বাংলা কিউআরের ফি নিয়ে ক্ষোভ, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাল্টা যুক্তি

সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর বেশি কাটলে ফেরত পাবেন গ্রাহক, রিটার্নেও মিলবে করছাড়

দৃষ্টান্তমূলক বাস্তবায়নে কমে আসবে অপরাধ

এ বিষয়ে কথা হয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, জাল মুদ্রা একটি সংঘবদ্ধ অপরাধ। তাই এটি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখা উচিত। তবে শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই হবে না, আইনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি আরও বলেন, খসড়া আইনে যদি জাল মুদ্রা সংরক্ষণ বা এ-সংক্রান্ত ব্যবসায় জড়িত থাকার জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়, তাহলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দৃষ্টান্তমূলকভাবে আইনটি বাস্তবায়ন করা গেলে এ ধরনের অপরাধ ধীরে ধীরে কমে আসবে। কারণ, জাল মুদ্রার ব্যবসা সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক। এর সঙ্গে প্রায়ই কালোবাজারি, অর্থপাচার, এমনকি মানবপাচারের মতো আরও বড় ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধের যোগসূত্র থাকে। ফলে এ অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতারের বিধান প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান আহ্বান জানান, এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রচলিত আইনি বিধান মেনে কাজ করতে হবে এবং গ্রেফতারের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে হাজির করার মতো সাংবিধানিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। অপরাধ দমনে কঠোরতা যেমন জরুরি, তেমনি সেই প্রক্রিয়ায় যেন কোনোভাবেই নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত না হয়, সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এমএএস/একিউএফ/এমএফএ