রাজশাহীর দোআঁশ ও পলি সমৃদ্ধ মাটিতে সবজি চাষে ঘটেছে নীরব বিপ্লব। সবজি চাষ করে এ অঞ্চলের কৃষক হয়েছেন আর্থিকভাবে সচ্ছল। কিন্তু চলতি মৌসুমে সবজির দাম নিয়ে কৃষকরা পড়েছেন চরম সংকট আর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এ সবজি উৎপাদনের সাফল্যই এখন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পটল, করলা, বেগুন, লাউ ও চাল কুমড়ার মাঠপর্যায়ে দাম বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এখন সর্বনিম্ন। রাজশাহীতে সবজির সবচেয়ে বড় মোকামগুলো থেকে ফড়িয়ারা করলা ও পটল কিনছেন কেজিপ্রতি ৬ টাকা। আর চাল কুমড়া ও লাউ প্রতি পিস ৫ টাকা। ফড়িয়া বা মধ্যস্বত্বভোগীরা দেশের ২০টি জেলার বড় মোকামগুলোতে রাজশাহীর উৎপাদিত সবজি চারগুণ বেশি দামে সরবরাহ করছেন। এভাবে ফড়িয়াদের পকেটে চলে যাচ্ছে কৃষকের ফসলের লভ্যাংশের টাকা। সবজির মূল্যে চরম ধস নামার কারণে কৃষকরা পটল, করলা এবং লাউ রাগ, ক্ষোভ আর অভিমানে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন। রাজশাহীর বড় সবজির মোকাম এবং খেতে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র দেখা গেছে।
রাজশাহীর নয় উপজেলার মধ্যে দুর্গাপুরে সবচেয়ে বেশি সবজি চাষ হয়। শুক্রবার সকালে উপজেলার কারবালার মাঠের মোকামে দেখা গেছে, হাইব্রিড ২৫০ থেকে ৩০০ এবং দেশি জাতের বড় করলা ১৫০ থেকে ২০০ টাকা মন বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক সাগর বলেন, ‘হাইব্রিড ৬ টাকা এবং দেশি ৫ টাকা কেজি দরে ১০ মন করলা বিক্রি করলাম। গত এক মাসে আমি ২০ হাজার টাকার করলা বিক্রি করেছি। করলা জমি থেকে তোলার জন্য শ্রমিক খরচ আর মোকামে নিয়ে আসতে ভ্যান ভাড়া উঠছে না। তিনি বলেন, ‘আমি এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় বাৎসরিক চুক্তিতে দুই বিঘা জমি লিজ নিয়েছি। প্রথম দফায় আলুচাষ করে আড়াই লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। করলা চাষেও ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লোকসান। এভাবে চলতে থাকলে কৃষক আর সবজি চাষ করবেন না।’ ফড়িয়া মহাতাজ আলী জানান, এসব করলার দাম নেত্রকোনা সদরের আড়তদাররা দেবেন কেজিপ্রতি ২০ থেকে ২২ টাকা। আর আড়তদাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবেন ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি। একই উপজেলার চুনিয়াপাড়া মোকামে গিয়ে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। সেখানে প্রতি পিস লাউ এবং চালকুমড়া ৫ থেকে ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষক হাসমত আলী বলেন, ‘গত বছরও লাউ ও চাল কুমড়া প্রতিপিস ২০ থেকে ২২ টাকা ছিল। আর বিক্রি করব না। এখন লাউ আর চাল কুমড়া গরু-ছাগলকে খাওয়াব।’ কুমিল্লা থেকে আসা ফড়িয়া শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর শুধু লাউ আর চাল কুমড়া না, সব সবজির দাম কম। আমি কুমিল্লার আড়তে এসব লাউ এবং চালকুমড়া অন্তত ১৮ থেকে ২০ টাকা করে বিক্রি করব। আর আড়তদাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করবেন ২৬ থেকে ২৮ টাকায়।’
চুনিয়াপাড়া থেকে তিন কিলোমিটার দূরে হাট কানপাড়া মোকামে দেখা গেছে কৃষক আব্দুল হালিমের হাহাকার। তিনি বিক্রির জন্য দুই ভ্যানে ২০ মন করলা এনেছিলেন। আড়াইশ টাকা মন দেখে তিনি করলা আড়তের বাইরে রাস্তায় ফেলে দেন। হাহাকার করে তিনি বলেন, ‘তিন বিঘা করলা চাষ করেছি। লিজের দুই লাখ ৪০ হাজার টাকা মধ্যে মাত্র এক লাখ টাকা জমির মালিককে দিয়েছি। চাষে খরচ করেছি অন্তত দেড় লাখ টাকা। আমি ঋণে জর্জরিত। ছেলে-মেয়ে নিয়ে এবার না খেয়ে মরতে হবে।’ জেলার মোহনপুরের মৌগাছিতে রয়েছে সবজির বড় মোকাম। এখানে পটল বিক্রি করছিলেন শাহিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমি তিন বিঘা জমিতে পটল চাষ করেছি। জমি লিজের টাকাসহ বিঘাপ্রতি চাষে খরচ হয়েছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। আজকে (শুক্রবার) ৬ টাকা কেজি দামে পটল বিক্রি করলাম। এতে পটল জমি থেকে তালার জন্য শ্রমিক খরচ আর ভ্যান ভাড়া উঠছে না।’ এছাড়া মৌগাছি মোকামে পেঁপে কেজিপ্রতি ৭ টাকা, চিচিঙা ১০ টাকা এবং কাঁচা মরিচ ৫০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। শুধুমাত্র মরিচে কৃষক কিছুটা দাম পেলেও ফড়িয়ারা পেঁপে এবং চিচিঙাসহ অন্য সবজি কম দামে কিনে চার থেকে পাঁচগুণ বেশি লাভ করছেন।
সার্বিক বিষয়ে কথা বলতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে শুক্রবার রাতে ফোন দেওয়া হয়। তখন তিনি বলেন, ‘কাল (শনিবার) এ ব্যাপারে কথা বলব।’ এরপর শনিবার তিনি আর ফোন ধরেননি। তবে অতিরিক্ত উপপরিচালক ড. মো. আব্দুল মজিদ বলেন, ‘সারা দেশে সবজির আবাদ বেশি। এ কারণে উৎপদানও বেশি। তবে বৃষ্টির কারণে সবজির উৎপাদন কমে যাবে। তখন কৃষক ভালো দাম পাবেন।’








