চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে থাকতে পারে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

সম্প্রতি প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (জুলাই ২০২৬) প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

এডিবির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এসবের প্রভাবে পরিবহন ব্যয়, বিভিন্ন ধরনের সেবা এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। যদিও ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশেই অবস্থান করছে।

প্রতিবেদনে এডিবি বলেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব, বিনিময় হার সমন্বয় এবং খাদ্য ও সেবা খাতে অব্যাহত মূল্যচাপ মূল্যস্ফীতি কমার গতি মন্থর করে দেবে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে ব্যক্তিগত ভোগব্যয়েও চাপ সৃষ্টি করছে।

সংস্থাটির মতে, দুর্বল বৈশ্বিক চাহিদার কারণে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি মাঝারি পর্যায়ে থাকবে। অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় না পৌঁছানোয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব পড়তে পারে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতও চাপে থাকবে।

এডিবি আরো সতর্ক করেছে, সারের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে কৃষি উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে সেবা খাত কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পর পাকিস্তানে গড় মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি হতে পারে, যার পূর্বাভাস ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আফগানিস্তানে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং নেপালে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪ শতাংশে সীমিত থাকতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা একই সময়ের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সেই অনুপাতে আয় বাড়ছে না, যা ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং জ্বালানি ও বিনিময় হার নীতিতে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।