গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বরাব এলাকায় প্রায় তিন দশক আগে বৈধভাবে জমি কিনে বসবাস শুরু করা ৩২টি পরিবার হঠাৎ করেই জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতায় পড়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি চক্র পাওয়ার অব অ্যাটর্নি তৈরি করে ওই জমির মালিকানা দাবি করছে এবং বসতভিটার স্বত্ব বজায় রাখতে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পুনরায় জমি কিনে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। দাবি না মানলে উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেন।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালিয়াকৈর উপজেলার বরাব মৌজার এসএ-১১৭, আরএস-৪২১, দাগ নম্বর-৫০৯ এবং আরএস-১৩৬১-এর আওতায় মোট ২৩৬ শতাংশ জমি বিভিন্ন সময়ে ক্রয় করেন ৩২টি পরিবার। জমি কেনার পর তারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কেউ পাকা ভবন, কেউ টিনশেড ঘর নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি নিয়মিত সরকারি খাজনা পরিশোধ করে আসছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, গত সপ্তাহে একই এলাকার সূর্বনা আক্তার শিল্পী (৪২), মো. ফরিদ সিকদার (৪০), শাহাদাত হোসেন রনি (৩০), মো. আনোয়ার হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন স্বপন (৪২) ও জুয়েল সিকদার (৪০) একটি নিবন্ধিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাগজ দেখিয়ে ওই জমি নিজেদের দাবি করেন। পরে তারা বসবাসরত পরিবারগুলোর কাছে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে জমি পুনরায় কেনার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি না হলে বাড়িঘর উচ্ছেদ করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
জানা গেছে, বরাব রেললাইনের পাশজুড়ে ৩২টি পরিবারের বসতি গড়ে উঠেছে। কোথাও বহুতল ভবন, কোথাও পাকা বা আধাপাকা ঘর। প্রতিটি পরিবারের জমির আলাদা সীমানা রয়েছে। কয়েকটি স্থানে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে, আবার কিছু জমিতে সবজি চাষ হচ্ছে। বিকেলে খোলা জায়গাগুলোতে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলাও চোখে পড়ে। তবে সম্প্রতি এসব ফাঁকা জায়গায় নতুন করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সাইনবোর্ডে উল্লেখ করা হয়েছে, দলিলমূলে বরাব মৌজার ওই জমির মালিক অভিযুক্তরা।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, প্রদর্শিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি জাল এবং এটি তৈরিতে কালিয়াকৈর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কিছু অসাধু ব্যক্তির সহযোগিতা রয়েছে। এ ঘটনায় তারা কালিয়াকৈর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পাশাপাশি বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যকেও অবহিত করা হয়েছে। সংসদ সদস্য সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তারা।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, প্রায় ৩০ বছর ধরে ভোগদখলে থাকা, নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করা জমির বিপরীতে কীভাবে নতুন করে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিবন্ধিত হলো এবং সেই কাগজের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি করা হচ্ছে- বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ভুক্তভোগী নাজমা ইসলাম বলেন, “আমরা কষ্ট করে জমি কিনে দীর্ঘদিন ধরে বাস করছি। এখন আমাদের বলা হচ্ছে, টাকা না দিলে এখানে থাকতে দেওয়া হবে না। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, আমরা যখন জমি কিনেছিলাম তখন যারা দলিলে সাক্ষী ছিলেন, তারাই এখন নতুন করে পাওয়ারনামা দেখিয়ে জমির মালিকানা দাবি করছেন।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিধারী জুয়েল সিকদার বলেন, “আমরা নিয়ম মেনেই পাওয়ার নিয়েছি। জমি নিয়ে অনেক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। আপনারা আমাদের সঙ্গে বসে কথা বললে পুরো বিষয়টি বুঝতে পারবেন।”
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হাসান বলেন, “পরিবারগুলো যে দলিলের মাধ্যমে জমি কিনেছে, সেটি রোটারি দলিল। অন্যদিকে যারা দাবি করছেন, তারা নিবন্ধিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি করেছেন। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্যের নজরে রয়েছে। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।”
এদিকে দীর্ঘদিনের বসতভিটা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়া পরিবারগুলো প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। তাদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করে হয়রানি ও উচ্ছেদের শঙ্কা থেকে তাদের রক্ষা করা হোক।








