জাতীয় সংসদ যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন ও জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ ও পবিত্রতম কেন্দ্রবিন্দু। জনগণের ট্যাক্সের কোটি কোটি টাকায় পরিচালিত প্রতিটি অধিবেশনের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। হিসাব মতে, জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালীন প্রতি মিনিটে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অথচ দেশের এই অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের একশ্রেণির সংসদ সদস্যের (এমপি) আচরণ ও বক্তব্য নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
গত ৭ জুন শুরু হওয়া বাজেট অধিবেশনে জনগুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও জনকল্যাণমূলক ইস্যু বাদ দিয়ে অনেক সংসদ সদস্য জড়িয়ে পড়েন ব্যক্তিগত কাদা-ছোড়াছুড়ি, অপ্রাসঙ্গিক উপমা, ব্যাকরণহীন ভাষা ও অদ্ভুত সব দাবিতে। এতে একদিকে যেমন মূল্যবান সময় অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে বারবার স্পিকারকে আপত্তিকর বক্তব্য ‘এক্সপাঞ্জ’ (কার্যবিবরণী থেকে বাদ) করতে হচ্ছে, যা সংসদের মান-মর্যাদাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
নতুন সংসদের সূচনা ও প্রত্যাশা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনামলে জাতীয় সংসদকে একদলীয় ও একপেশে করে চরম বিতর্কিত করা হয়েছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। ফলস্বরূপ, সংসদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে নিয়ে জনগণের মনে নতুন ও আকাশচুম্বী প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছিল।
গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম অধিবেশনের সূচনাও হয়েছিল বেশ আশাব্যঞ্জকভাবে। সে সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার ভাষণে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছিলেন, তিনি জাতীয় সংসদকে সব যুক্তিতর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান। একই সুরে সুর মিলিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, এই নবগঠিত সংসদ একটি গতিশীল, প্রাণবন্ত ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা চরিত্র হননের পরিবর্তে কেবল জনগণের কল্যাণমূলক বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলা প্রথম অধিবেশন বেশ প্রাণবন্ত হলেও, গত ৭ জুন শুরু হওয়া দ্বিতীয় (বাজেট) অধিবেশনে এসে সেই আশার গুড়ে বালি পড়েছে।
চলমান বাজেট অধিবেশনে সংসদ সদস্যদের যেসব বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনা ও হাস্যরসের জন্ম দিয়েছে, তার একটি বিস্তারিত খতিয়ান নিচে দেওয়া হলো:
অনুপস্থিত ব্যক্তির চরিত্র হনন ও স্পিকারের দুঃখ প্রকাশ গত ১৮ জুন বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা-১ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য খোন্দকার আবু আশফাক সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে সংসদের বাইরে থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের ব্যক্তিগত জীবনের একটি পুরনো রিসোর্ট বিতর্ক টেনে আনেন এবং তার ‘মুতা বিয়ে’ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। সংসদের সদস্য নন এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেই- এমন একজন ব্যক্তির চরিত্র হনন করায় সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের ও চিফ হুইপ নূরুল ইসলামের তীব্র প্রতিবাদের মুখে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বক্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করেন।
পরদিন স্পিকার নিজের দেওয়া একটি মন্তব্যও (যেখানে তিনি মামুনুল হকের জীবনের অন্ধকার অংশ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছিলেন) স্বউদ্যোগে এক্সপাঞ্জ ঘোষণা করেন। স্পিকার সংসদকে সতর্ক করে বলেন, যার পক্ষে এখানে এসে নিজেকে ডিফেন্ড করা সম্ভব নয়, তার উদ্দেশে কোনো বিরূপ মন্তব্য আপনারা করবেন না। এই ঘটনার প্রতিবাদে খেলাফত মজলিস রাজপথে বিক্ষোভ মিছিলও করে।
জীবিত বাবাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা অধিবেশনের সবচেয়ে বড় ‘স্লিপ অব টাং’ বা মুখের ভুলের জন্ম দেন নীলফামারী–৪ আসনের জামায়াতদলীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। ১৪ জুন বাজেট বক্তৃতায় নিজের আবেগ ও পারিবারিক অবদান প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি দাবি করে বসেন, “আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা।” অথচ বাস্তবে তার বাবা এখনো জীবিত আছেন। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ট্রল ও সমালোচনার বন্যা বয়ে যায়। পরবর্তীতে ব্যাপক বিতর্কের মুখে নিজের ভুল স্বীকার করে বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারের কাছে লিখিত চিঠি দেন এই সংসদ সদস্য।
ঋণখেলাপির সংসদ বনাম ঋণগ্রস্তের সংসদ ১৮ জুন প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা চলমান ত্রয়োদশ সংসদকে ঋণ খেলাপির সংসদ বলে তীব্র কটাক্ষ করেন। তার এই মন্তব্যে সরকারি দলের সদস্যরা ক্ষুদ্ধ হন। সরকারদলীয় সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন দাবি করেন, এই সংসদে কোনো ঋণখেলাপি নেই এবং শব্দটি এক্সপাঞ্জ করা হোক। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অদ্ভুত এক যুক্তি দিয়ে বলেন, এখানে কেউ ঋণখেলাপি না, তবে ঋণগ্রস্ত হতে পারেন। তবে, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম রুমিন ফারহানার পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেন, সার্বভৌম সংসদে ঋণখেলাপিদের ঋণখেলাপি বলতে না পারলে কোথায় বলবেন?
ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন-ওভেনের আবদার ও উপহাস ১৭ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান বাজেট আলোচনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে দাবি করেন, সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দকৃত ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও উন্নত মানের পর্দা দেওয়া হোক। একজন জনপ্রতিনিধির মুখে এই বিলাসী আবদার শুনে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
এর পরদিন বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিষয়টিকে আরো রসাত্মক ও বিতর্কিত করে তোলেন। তিনি মিজানুর রহমানকে উপহাস করে বলেন, ওই সদস্যকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মাইক্রোওভেন কিনে দিতে চান এবং প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিং মেশিন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে পর্দা দেওয়ার অনুরোধ জানান।
অধিবেশনে এ প্রসঙ্গের সমালোচনা করে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, “অনেক কষ্টের পরে এই পার্লামেন্ট (সংসদ) আমরা পেয়েছি। আমি আমার প্রথম বক্তব্যেও বলেছিলাম, এই সংসদের সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো এখানে স্বৈরাচারের কোনো দোসর বা ফ্যাসিস্টদের (ফ্যাসিবাদী) কেউ নেই।”
তিনি বলেন, গত সংসদ কেবল গণতন্ত্র ও পার্লামেন্টকে হত্যা করেনি, পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডার্ডকে সাংঘাতিকভাবে নষ্ট করেছে। আমরা দেখেছি, এখানে গান হয়েছে, অন্য কিছু হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে, সরাসরি ওদিকে না গেলেও কিছু কিছু জায়গায় কিন্তু আমরা ওদিকে চলে যাচ্ছি।
পার্থ বলেন, কাল সংসদ থেকে যাওয়ার পরে আমি অনেক টেলিফোন পাই। ডেইলি স্টার নিউজ করে জামায়াত এমপি ডিমান্ডস ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ, অ্যান্ড কার্টেইনস ইন এমপিস ফ্ল্যাটস এটা আমাকে অনেক লজ্জা দেয়। আমি মনে করি, এই পার্লামেন্টকেও অনেক লজ্জা দেয়।
এই ব্যক্তিগত কাদা-ছোড়াছুড়ির জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওনার কাছে চাইছে নাকি? আমাদের মানসিকতাগুলো এমন হওয়া উচিত, এখানে দাঁড়িয়ে কারও সম্মানে আঘাত করব না।
পিন খোলা চেয়ার ও ওজনের ফিরিস্তি জনগুরুত্বপূর্ণ বাজেট আলোচনার সময় ১৭ জুন পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিএনপির সিনিয়র সংসদ সদস্য জয়নাল আবদিন ফারুক অভিযোগ করেন যে, অধিবেশন কক্ষের চেয়ারগুলোর পেছনের পিন খোলা থাকায় সংসদ সদস্যদের হাত কেটে যাচ্ছে। এমনকি চেয়ারগুলোর অতিরিক্ত ওজন নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। রাষ্ট্রের এত ব্যয়বহুল সময়ে চেয়ারের পিন আর ওজন নিয়ে আলোচনা করায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে বর্ণবাদী মন্তব্য ১৪ জুন জামায়াতের সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পোশাক ও পর্দা নিয়ে ইঙ্গিত করে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী কটাক্ষ করে বলেন, কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা? । এই মন্তব্যে নারী সংসদ সদস্যদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় আঘাত লাগায় পুরো বিরোধী দল একযোগে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং সংসদের কার্যক্রম কয়েক মিনিটের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল মন্তব্যটি এক্সপাঞ্জ করলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম এই বক্তব্যকে একটি ‘অমার্জনীয় অপরাধ ও বর্ণবাদী আচরণ’ হিসেবে আখ্যা দেন।
কিলিং দ্য ইংলিশ খিচুড়ি ভাষার ১১ মিনিট ১৬ জুন সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য জীবা আমিন খান দেশের ভাঙাচোরা গ্রামীণ সড়কের জন্য বিগত সরকারের দুর্নীতির সমালোচনা করতে গিয়ে বাংলা ও ইংরেজির এক অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটান। তিনি অত্যন্ত ভুল ব্যাকরণে বলেন, সিক্সটিন হানড্রেড মাইল অফ কাঁচা রাস্তা। দ্য রাস্তাস আর ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন, দিস ইজ ডিউ টু দুর্নীতি। তার এই ১১ মিনিটের বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক হাস্যরসের সৃষ্টি করে।
বাজেটে চানাচুরের পুষ্টিগুণ খোঁজার চেষ্টা ১৪ জুন গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ১০০ গ্রাম চানাচুরের পুষ্টিগুণ (ক্যালরি ৫০০-৫৫০ কিলোক্যালরি, ফ্যাট ৩৫ গ্রাম, প্রোটিন ১০ গ্রাম) বর্ণনা করেন এবং বাজেটে চানাচুরের পুষ্টিগুণ জানার জন্য কমিটি গঠনের বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেন। মূলত বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এই বাজেটকে ‘খেতে ভালো কিন্তু পুষ্টিগুণহীন চানাচুরের মতো’ বলে যে উপমা দিয়েছিলেন, তার জবাব দিতে গিয়েই এই সংসদ সদস্য সংসদের মূল্যবান সময় অপচয় করে চানাচুরের পুষ্টির বিবরণ দেন।
অশ্লীল উপমা ও মুক্তিযোদ্ধাদের জামায়াত করা বিতর্ক ১৬ জুন নীলফামারী-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার বাজেট আলোচনায় ‘চালুনি ও সুচের’ একটি অরুচিকর ও অশ্লীল লোকজ উপমা ব্যবহার করলে স্পিকার তা এক্সপাঞ্জ করেন। এর আগে, প্রথম অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য জামায়াত করতে পারে না, যদি কেউ করে সেটা ডাবল অপরাধ। এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের মারমুখী আচরণের কারণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ একপর্যায়ে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না। সদস্যদের কর্মকাণ্ডে নাতিরা গ্যালারিতে বসে লজ্জা পাবে।
কার্যপ্রণালী বিধি কী বলে? জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে সংসদ সদস্যদের বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পষ্ট কিছু নির্দেশনা রয়েছে। বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা:
কোনো বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সংসদে কথা বলতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপ্রধান বা কোনো সম্মানিত ব্যক্তির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করতে পারবেন না।
কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক, কটু, অরুচিকর বা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতে পারবেন না।
ব্যক্তিগত আক্রমণ বা সংসদের বাইরে থাকা কোনো ব্যক্তির চরিত্র হনন করতে পারবেন না। কিন্তু চলতি অধিবেশনে এই বিধিগুলোর ক্রমাগত লঙ্ঘন দেখা যাচ্ছে।
সংসদের এমন নিম্নমানের আলোচনা নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “জাতীয় সংসদে সদস্যরা যে ধরনের নিম্নমানের কথাবার্তা বলেন, তা চরম মর্যাদাহানিকর। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে এসে যদি তারা এমন আচরণ করেন, তবে তা সংসদকে নেতিবাচক ধারায় ফেলবে। আমাদের সংবিধানে (৫৯ অনুচ্ছেদে) সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণের কথা বলা হলেও, অনেক সংসদ সদস্য স্থানীয় উন্নয়ন কাজে বেশি আগ্রহী, যা সংবিধান পরিপন্থী। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ভবিষ্যতে মনোনয়নের ক্ষেত্রে সংসদীয় কাজে দক্ষ ও আগ্রহী ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া।
বিরোধীদলীয় হুইপ ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সংসদকে কার্যকর রাখার মূল দায়িত্ব সরকারের। তবে, তাদের সংসদ সদস্যরা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে এবং ব্যাংকলুটকারী এস আলমের মতো স্বার্থান্বেষী মহলের পক্ষে সাফাই গেয়ে সংসদকে অকার্যকর করছে। আমাদের সংসদ সদস্যদের আরো সংযত ও গঠনমূলক ভাষায় কথা বলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
সরকারদলীয় প্রবীণ সংসদ সদস্য ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “এবার এই ব্যতিক্রমী সংসদে অনেকেই প্রথমবারের মতো নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। তারা মনের আবেগ থেকে কথা বলতে গিয়ে হয়তো কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে ফেলছেন। বিগত সংসদগুলোর চেয়ে এবারের সংসদ অনেক প্রাণবন্ত এবং স্পিকার প্রতিনিয়ত সবাইকে সতর্ক করছেন। আশা করি, এই সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে।”
জাতীয় সংসদের সাবেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, “একটি দেশের অগ্রগতির দর্পণ হলো তার জাতীয় সংসদ। সংসদের প্রতি মিনিটের পেছনে ব্যয় হওয়া জনগণের রক্ত পানি করা আড়াই লক্ষাধিক টাকা যেন চানাচুরের পুষ্টিগুণ কিংবা চেয়ারের ওজন মাপার পেছনে নষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংসদ সদস্যদেরই। রাজনৈতিক দলগুলোর কঠোর নির্দেশনা এবং স্পিকারের কঠোর ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে একটি অর্থবহ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া সম্ভব।”
তিনি বলেন, “মানুষ সংসদে হাস্যরস বা ব্যক্তিগত কটাক্ষের চেয়ে দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে কার্যকর আলোচনা দেখতে চায়। সংসদে সরকারের সমালোচনা যেমন থাকবে, তেমনি বিকল্প প্রস্তাবও থাকবে। তবে সেই বিতর্ক হতে হবে তথ্যভিত্তিক, শালীন ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক।”








