বিশ্ব রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের মার্কিন আধিপত্য কি তবে ফিকে হয়ে আসছে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে বিশ্বমঞ্চে একক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার যে দাপট ছিল, তাতে ফাটল ধরার নতুন এক চিত্র সামনে এল। এতদিন বৈশ্বিক অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর আদর্শিক নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হলেও সময়ের পরিক্রমায় সেই চিরাচরিত সমীকরণ এখন দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে।ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের মানুষের কাছে এখন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চীন অনেক বেশি ইতিবাচক এবং গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০০২ সালে বৈশ্বিক জনমত নিয়ে গবেষণা শুরু করার পর এই প্রথমবার চীন জনপ্রিয়তার দৌড়ে আমেরিকাকে পেছনে ফেলতে সক্ষম হলো।৩৬টি দেশের প্রায় ৪২ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত এই জরিপ বলছে, ২৫টি দেশের মানুষই এখন আমেরিকার চেয়ে চীনকে বেশি পছন্দ করেন। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নাটকীয়ভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টারট্রাম্প বনাম শিবিশ্ব নেতাদের ওপর আস্থার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওপর মানুষের আস্থা বেশি। যদিও দুই নেতার কারোরই আস্থার হার সামগ্রিকভাবে ৫০ শতাংশের বেশি নয়, তবে ট্রাম্পের তুলনায় শি জিনপিংকে অনেক বেশি ‘স্থিতিশীল’ নেতা হিসেবে দেখছে বিশ্ববাসী।পিউ রিসার্চের গবেষক জোনাথন শুলম্যান জানান, "মানুষ সাধারণত শি জিনপিংয়ের ব্যাপারে খুব বেশি কড়া কোনো মন্তব্য করে না, কিন্তু ট্রাম্পের ব্যাপারে তাদের মতামত বেশ চরম–হয় খুব ভালো, নাহয় খুব খারাপ।" বিশেষ করে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন নীতিতে যে অস্থিরতা দেখা গেছে, তা অনেক দেশের মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা হারাতে বাধ্য করেছে।এতদিন পর্যন্ত ব্যক্তিগত স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জোরালো ভাবমূর্তি ছিল। এবারের জরিপেও অধিকাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন যে, চীন সরকার অপেক্ষা মার্কিন প্রশাসন নিজ নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত কয়েক বছরে এই সূচকে আমেরিকার অবস্থান আশঙ্কাজনক হারে নিচে নেমেছে। ২০২১ সালের তুলনায় ইউরোপের দেশগুলোতে আমেরিকার এই ভাবমূর্তি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।অন্যদিকে, অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা অত্যন্ত নেতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন আমেরিকা অন্য দেশের বিষয়ে মাত্রাতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে। চীনের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪৫ শতাংশ। দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোর ৭২ শতাংশ মানুষ এখন চীনকে একটি ‘নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করছে।কার্নেগি চীনের গবেষক ডক্টর চং জা ইয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা এবং সামরিক হস্তক্ষেপের ভয় মানুষকে চীনের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, "চীনের জনপ্রিয়তা কতটা দীর্ঘস্থায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, তবে বেইজিং বর্তমানে বিশ্বমঞ্চে অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং ভবিষ্যদ্বাণীযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।"আঞ্চলিক মেরুকরণজরিপে দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চীনের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। পাকিস্তানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনের পক্ষে, যেখানে জাপানে এই হার মাত্র ১১ শতাংশ। অন্যদিকে, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত এবং ইসরায়েলের মতো যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো মিত্র দেশগুলো এখনো ওয়াশিংটনকেই বেশি পছন্দ করে।তবে সিঙ্গাপুরের মতো ধনী এবং উন্নত দেশগুলোতেও চীনের প্রতি উচ্চমাত্রার ইতিবাচক মনোভাব দেখা গেছে, যা বিশ্লেষকদের অবাক করেছে। চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও বেইজিংয়ের প্রভাব ও জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে বেড়েছে।বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির অস্থিরতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময়কার অনিশ্চিত সিদ্ধান্তগুলো অনেক রাষ্ট্রকে চীনের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। বেইজিং সুকৌশলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিনিয়োগ এবং স্থিতিশীলতার আশ্বাস দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করছে।নতুন যুগের সূচনা?এর আগে জর্জ ডব্লিউ বুশের মেয়াদের শেষ দিকে (২০০৮) এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুতে (২০১৭) আমেরিকার জনপ্রিয়তা কিছুটা কমলেও তা চীনের সমান বা নিচে নামেনি। এবারই প্রথম চীন জনপ্রিয়তার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, আমেরিকা যখন তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং মিত্রদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে, চীন তখন সুকৌশলে তার ‘সফট পাওয়ার’ ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মন জয় করে নিচ্ছে।'\