দেশে জরায়ুমুখের ক্যানসার পরিস্থিতি দিন দিন আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে সাড়ে ২৬ হাজারেরও বেশি নারী এই মরণব্যাধিতে ভুগছেন।
তথ্য বলছে, দেশে প্রতিবছর নতুন করে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নারী এই ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা ৫ হাজার ৮০০ ছাড়িয়ে গেছে। নারীদের ক্যানসারে মৃত্যুর হারের দিক থেকে স্তন ক্যানসারের পরেই জরায়ুমুখের ক্যানসারের অবস্থান।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মোট নারী ক্যানসার রোগীদের মধ্যে ১৯ শতাংশই প্রজনন অঙ্গ সম্পর্কিত ক্যানসারে আক্রান্ত। এর মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসারে ভুগছেন ১১ শতাংশ নারী। এছাড়া ৫ শতাংশ ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে এবং ৩ শতাংশ জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত।
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন করে ৮ হাজার ২৬৮ জন নারীর শরীরে শনাক্ত হচ্ছে জরায়ুর ক্যানসার। বছরে জরায়ুমুখের ক্যানসারে মারা যাচ্ছেন ৪ হাজার ৯৭১ জন নারী।
হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে (এইচপিভি) জরায়ুমুখ ক্যানসারের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। ১০০টিরও বেশি প্রজাতির এইচপিভি আছে, যার মধ্যে দুই ধরনের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কারণে এই ক্যানসার হয়ে থাকে। তবে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশের পরপরই ক্যানসার হয় না। জীবাণু প্রবেশের পর ১৫ থেকে ২০ বছরও সময় লাগে জরায়ুমুখের ক্যানসার হতে। তার মানে হলো- এটি নির্ণয়ে অনেকটা সময় পাওয়া যায়, তাই নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
প্রত্যেক নারীই তার জীবনে কখনো না কখনো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। কিন্তু আক্রান্ত হওয়া মানেই ক্যানসার হওয়া নয়। শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে এই ইনফেকশন আপনাতেই ঠিক হয়ে যায়।—অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন
এ ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে ১০ বছর বয়সী সব কিশোরীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ১ ডোজ এইচপিভি (HPV) টিকা দেওয়া হচ্ছে। দেশের প্রতিটি স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে এই টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে চলমান রয়েছে।
আরও পড়ুন
জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলে দেশে আইপিভিএস চ্যাপ্টারের যাত্রা শুরু
জানতে চাইলে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশে নারীদের ক্যানসারের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। অথচ একটু সচেতন হলেই এই ক্যানসার কিন্তু শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
‘শতকরা ৯৮ থেকে ৯৯ ভাগ জরায়ুমুখের ক্যানসারের সঙ্গেই এইচপিভি ভাইরাসের সংক্রমণের সম্পর্ক আছে। প্রত্যেক নারীই তার জীবনে কখনো না কখনো এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন। কিন্তু আক্রান্ত হওয়া মানেই ক্যানসার হওয়া নয়। শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে এই ইনফেকশন আপনাতেই ঠিক হয়ে যায়।’

‘তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ইনফেকশনটা দূর হয় না। আর তখনই তা ধীরে ধীরে ক্যানসারের দিকে যায়। খুব অল্প বয়সে বা বাল্যবিয়ে হওয়া, অল্প বয়সে মা হওয়া, ঘন ঘন সন্তান হওয়া বা অনেক বেশি সন্তান নেওয়া, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ঠিকমতো বজায় না রাখা এবং একাধিক শারীরিক সঙ্গী থাকা এই ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।’
এই ক্যানসার বিশেষজ্ঞের মতে, যেহেতু মূল অপরাধী এইচপিভি ভাইরাস, তাই এর বিরুদ্ধে টিকা দেওয়াটাই হলো প্রাথমিক প্রতিরোধ। এই টিকা দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত বয়স হলো ৯ থেকে ১৫ বছর। অর্থাৎ, বিয়ে বা শারীরিক সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেই এই টিকা দিয়ে দিতে হবে। আগে এই টিকার দুটি ডোজ দেওয়া লাগতো, তবে এখন দেখা গেছে একটি ডোজ দিলেই প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এটি দারুণ কাজ করে।
আরও পড়ুন
দেশে প্রতিবছর জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্ত হন ১২ হাজার নারী
‘বাংলাদেশে স্কুলের চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণির মেয়েদের এবং স্কুলের বাইরে থাকা ৯-১৪ বছরের মেয়েদের এই টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। বর্তমানে এর কাভারেজ প্রায় ৯২ শতাংশ। টিকা দেওয়ার পরও ৩০ বছর বয়সের পর থেকে বিবাহিত প্রত্যেক নারীর প্রতি পাঁচ বছর পর পর স্ক্রিনিং বা নিয়মিত চেকআপ করানো উচিত।’
বাংলাদেশে চ্যাপ্টারের প্রতিষ্ঠা এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধ, জরায়ুমুখ ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।—ডা. লুৎফা বেগম লিপি
‘আমাদের দেশে বর্তমানে সরকারিভাবে ভায়া (VIA) পরীক্ষা করা হচ্ছে, যেন কোনো ব্যথা বা কষ্টদায়ক অনুভূতি হয় না। এটি খুব সহজ পদ্ধতি, তবে এ পরীক্ষার কিছু দুর্বল দিক আছে এবং অনেক সময় এটি ভুল ফলাফল দেয়। তাই ভায়া পজিটিভ হলে আমরা কোলপোস্কোপি করি এবং প্রয়োজনে এক টুকরো মাংস নিয়ে বায়োপসি করি।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে এই ক্যানসার নির্মূল করতে ৯০ শতাংশ মেয়েকে ১৫ বছরের মধ্যে টিকা দেওয়া, ৭০ শতাংশ নারীকে জীবনে অন্তত দুবার স্ক্রিনিং করানো এবং ৯০ শতাংশ চিহ্নিত রোগাক্রান্ত নারীকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে বলেও জানান অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন।
তার কথায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখন বলছে ভায়া পরীক্ষা এখন আর তেমন কার্যকর নয়, এর চেয়ে লেটেস্ট এবং সবচেয়ে কার্যকর পরীক্ষা হলো এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট (HPV DNA Test)। জরায়ুমুখ থেকে টিস্যু নিয়ে জেনেটিক পদ্ধতিতে ভাইরাসের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়, যা একবার নেগেটিভ হলে পরবর্তী ৫ থেকে ১০ বছর আর কোনো চিন্তাই থাকে না। বাংলাদেশে আমরা এখনো এ পরীক্ষাটি পুরোদমে শুরু করতে পারিনি।
বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সংকট ও করণীয় নিয়ে ডা. হাবিবুল্লাহ বলেন, আমাদের দেশের নারীরা লজ্জা ও সংকোচের কারণে রোগ লুকিয়ে রাখেন। তারা একদম শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসেন। দেশে ক্যানসারের সুনির্দিষ্ট হিসাব জানার জন্য নিজস্ব ‘ক্যানসার রেজিস্ট্রি’ বা নিবন্ধন থাকা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি স্ক্রিনিং হাসপাতাল-কেন্দ্রিক না করে গ্রাম, ইউনিয়ন বা থানা ধরে ধরে কমিউনিটি-ভিত্তিক করতে হবে।
আরও পড়ুন
প্রয়োজন নিয়মিত স্ক্রিনিং / মধ্যবয়সী নারীরা জরায়ুমুখ ক্যানসারে বেশি আক্রান্ত, মূলে বাল্যবিয়ে
তিনি বলেন, কোভিডের সময় দেশের জেলা-উপজেলায় কেনা পিসিআর মেশিনগুলো এখন অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে, যা ব্যবহার করেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক ‘এইচপিভি ডিএনএ টেস্ট' শুরু করা সম্ভব। এছাড়া রোগ বেড়ে গেলে রেডিওথেরাপি লাগে, অথচ সরকারি পর্যায়ে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল’—এ মাত্র ছয়টি রেডিওথেরাপির মেশিন আছে, যা ১৮ কোটি মানুষের দেশের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল।

‘তার ওপর মেশিনগুলো প্রায়ই নষ্ট থাকে এবং বেসরকারি হাসপাতালে এই অপারেশনের খরচ প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা, যা দরিদ্র মানুষের পক্ষে বহন করা অসম্ভব।’
জরায়ুমুখ ক্যানসারে মৃত্যুহার অনেক বেশি। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস এইচপিভি ও জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে ভ্যাক্সিনেশনের কোনো বিকল্প নেই। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এইচপিভি সমস্যা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।—অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ
‘তাই জরায়ুমুখের ক্যানসার থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে অনতিবিলম্বে নিকটস্থ টিকাকেন্দ্রে নিয়ে ১০ বছর বয়সী কিশোরীদের এইচপিভি টিকা দিতে হবে’—যোগ করেন অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জরায়ুমুখ ক্যানসারে মৃত্যুহার অনেক বেশি। হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস এইচপিভি ও জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধে ভ্যাক্সিনেশনের কোনো বিকল্প নেই। মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এইচপিভি সমস্যা এখন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সম্পর্কিত রোগ প্রতিরোধ করতে হলে প্রাথমিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, স্ক্রিনিং, ভ্যাক্সিনেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়সমূহ বাস্তবায়নে প্যাথলজিস্ট, ভাইরোলজিস্ট, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠান, গবেষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাই ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে নিরন্তর কাজ করে যেতে হবে’—বলছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার।
আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সমন্বয়ক ডা. লুৎফা বেগম লিপির ভাষ্য, বাংলাদেশে এই চ্যাপ্টারের প্রতিষ্ঠা এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধ, জরায়ুমুখ ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এসইউজে/এমকেআর







