‘অতিথি ডটকম’ নামের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অভিনব প্রতারাণার ফাঁদ পেতে বসেছেন সাইফুল ইসলাম সোহেল। যিনি প্রতারক হিসাবে চিহ্নিত। তার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে দেশের হাজার হাজার বেকার যুবক সর্বস্বান্ত হয়েছে। দুই দশক আগে যার প্রতারণা শুরু হয়েছিল ডেসটিনি ২০০০ দিয়ে। এরপর তার মতো প্রতারকদের সহায়তায় ইউনিপেটুইউ, যুবক, এমটিএফই এবং এহসান গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের হাজার কোটি টাকা লুট করেছে।

এই সোহেল ফের ‘অতিথি ডটকম’ নিয়ে মাঠে নেমেছে। এটিকে ডিজিটাল চেইন মার্কেটিং হিসাবে দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আন্তর্জাতিকমানের এই ট্রাভেল ও সার্ভিস পোর্টালে বিনিয়োগ করলে ঝামেলামুক্ত বিপুল আয় নিশ্চিত। কেউ চাইলে দ্রুত কোটিপতিও হতে পারবেন। অলীক সব স্বপ্ন। কিন্তু বাস্তবতা হলো-অতিথি ডটকমের আড়ালে রয়েছে এক অন্ধকার ফাঁদ। ইতোমধ্যে অনেকে এ ফাঁদে আটকা পড়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ নীরব। ২০০০ সালের শুরুতে ডেসটিনি কার্যক্রম শুরু করলে সাইফুল সেখানে একজন সাধারণ কর্মী হিসাবে যোগ দেন। পরে তিনি ‘পিএসডি’ (প্রফিট শেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন) পর্যায়ে উন্নীত হন। ডেসটিনি যখন ভেঙে পড়ে এবং এর শীর্ষ কর্মকর্তারা জেলে যান, ততদিনে সাইফুল নিজের আখের গুছিয়ে ফেলেন। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে সটকে পড়েন। সেই ডেসটিনিরই আদলে ২০১৬ সালে গড়ে তোলেন ‘নোভেরা প্রডাক্টস লিমিটেড’। মিরপুর ডিওএইচএসে আলিশান অফিস খুলে ই-কমার্সের নামে শুরু করেন পিরামিড স্কিম। ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি এই স্কিমের নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৪৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করেন।

নারী নির্যাতন মামলায় পুলিশ সাইফুল ইসলাম সোহেলকে ২০১৮ সালের ১১ অক্টোবর রাজধানীর পল্লবী থেকে গ্রেফতার করে। তার পালিত পিতার নাম দলিল উদ্দিন। কয়েক মাস জেল খেটে ছাড়া পান। পরে প্রতারণা মামলায় ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল পল্লবী থানা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশের অরগানাইজড ক্রাইম প্রিভেনশন টিম। ওই বছরের শেষদিকে তিনি ছাড়া পান। ফের তিনি প্রতারণা ব্যবসা শুরু করেন। ই-কমার্স নামে ব্যবসা শুরু করার ঘোষণা দিয়ে পর্দার আড়ালে নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছেন রমরমা এমএলএম কারবার।

চল্লিশোর্ধ এই প্রতারকের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার পূর্ব চাঁদপুরা। তার বিরুদ্ধে রাজধানী ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি ডেসটিনি-২০০০ এবং নভেরা প্রডাক্টের শীর্ষ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতারণার কারণে তাকে গ্রেফতারের দাবিতে বিভিন্ন সময়ে ভুক্তভোগীরা মিছিল ও মানববন্ধন করেন।

কিন্তু জেল থেকে বের হয়েই সেই ৬ বছর আগে ‘অতিথি ডটকম’ নামে আরও বড় প্রতারণার ফাঁদ পেতে বসেন। তবে প্রতারণা আড়াল করতে নতুন বেশ ধরে। আগে মানুষ পণ্য দেখে বিনিয়োগ করত, এখন বিনিয়োগ করছে ‘অ্যাপ’ দেখে। গুগল প্লে-স্টোরে থাকা ‘অতিথি ডটকম’ অ্যাপটিকে প্রচার করা হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিকমানের ট্রাভেল ও সার্ভিস পোর্টাল হিসাবে। এখানে দাবি করা হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে দেশের যে কোনো প্রান্তের হোটেল বুকিং দেওয়া যাবে। খুব সহজে মিলবে প্রাইভেটকার এবং অ্যাম্বুলেন্স সেবা। এমনকি হেলিকপ্টার বা বিমান টিকিটও বুকিং দেওয়া যাবে। কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে নেমে মিলেছে একেবারে ভিন্ন তথ্য। প্রতিবেদক নিজেই সদস্য হতে কয়েক দফা অতিথি ডটকমের কার্যালয়ে গেলে প্রতারণার চাঞ্চল্যকর তথ্য ধরা পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বুকিং সেবাগুলো স্রেফ একটি আইনি ঢাল। মূলত স্রোতের মতো টাকা ঢুকছে এজেন্ট নিয়োগ থেকে। অ্যাপটিতে লগইন করার পর একজন সাধারণ গ্রাহককে ‘এজেন্ট’ হতে প্ররোচিত করা হয়। এই এজেন্টশিপের জন্য জনপ্রতি ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চেইন মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে একজন এজেন্ট যখন আরও দশজন এজেন্ট নিয়ে আসেন, তখন তিনি পান মোটা অঙ্কের কমিশন। এটিই হলো বিশুদ্ধ ‘পিরামিড স্কিম’, যা বাংলাদেশের আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একটি সুসংগঠিত এবং পেশাদার এমএলএম বা পিরামিড স্কিম কোম্পানি যেভাবে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলে, ঠিক সেভাবে ফাঁদে ফেলছে ‘অতিথি ডটকম’। প্রতারণা সফল করতে মগজ ধোলাইসহ আধুনিক নানা কলাকৌশল ব্যবহার করা হয়। ডেসটিনি বা নোভেরা প্রডাক্টসের সনাতন পদ্ধতিকে তারা এখন রূপান্তর করেছে ডিজিটাল ও করপোরেট প্রলোভনে।

সরেজমিন অনুসন্ধানকালীন এই প্রতিবেদক ছদ্মবেশে অতিথি ডটকমের এজিএম (ট্রেনিং) মাহবুব আলম খানের মাধ্যমে ২৫০০ টাকায় সদস্যপদ গ্রহণ করেন। যার আইডি নং ২০৩৮৩৮। এরপর মাহবুব আলম বিভিন্ন ভুঁইফোঁড় প্রজেক্টের নাম বলে প্রতিবেদককে নতুন সদস্য সংগ্রহের জন্য নানাভাবে প্রলোভন দেখাতে শুরু করেন। তিনি নিজেদের এমএলএম বলতে নারাজ। বরং তারা নিজেদের ‘ডিজিটাল চেইন মার্কেটিং’ বা ‘ই-কমার্স এফিলিয়েট পার্টনারশিপ’ হিসাবে প্রচার করতে চান।

সদস্য টানতে তারা মূলত তিনটি প্রধান প্রলোভন সামনে রাখেন। প্রথমত, আজীবন বা প্যাসিভ ইনকামের ফাঁদ পেতে শিক্ষিত বেকার যুবক এবং গৃহিণীদের টার্গেট করা। তাদের বলা হয়, আপনি মাত্র একবার এজেন্ট ফি দিয়ে যুক্ত হবেন। এরপর ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার অ্যাকাউন্টে প্রতি মিনিটে টাকা জমা হতে থাকবে। বসে বসে এমন আয়ের প্রলোভনটি মানুষ সহজেই লুফে নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সদস্য হিসাবে যোগ দিতে হয় তাদের জাঁকজমকপূর্ণ সেমিনার ও মোটিভেশনাল স্পিচ সেশনে। ঢাকার সদস্য হিসাবে অভিজাতপাড়া গুলশানের পুলিশ প্লাজার করপোরেট অফিসে শুরু হয় প্রথম সেমিনার। তবে দেশের অন্য জেলাগুলোর জেলা শহরের অভিজাত রেস্টুরেন্টে বসানো হয় মগজ ধোলাইয়ের সেশন। মোটিভেশন হিসাবে আগে থেকে নির্ধারিত তরুণ-তরুণীদের সফল সদস্য হিসাবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় লাখ টাকার চেক। তারা শোনান বিলাসবহুল লাইফস্টাইলের গল্প। এতে সহজে প্রলুব্ধ আর বিমোহিত হন এই প্রতিবেদকের মতো অসংখ্য নবাগত। কিন্তু বাস্তবতা হলো-সবই সাজানো নাটক। তৃতীয়ত, নেটওয়ার্কিং বা চেইন বোনাসের মারপ্যাঁচে তারা সদস্যদের বোঝান যে, কেউ নিজে কাজ করলে পাবেন ১০%, কিন্তু তিনি যদি নিচের টায়ারে আরও ৫ জন ‘এজেন্ট’ যুক্ত করতে পারেন, তবে তাদের আয় থেকেও আজীবন কমিশন পাবেন। এই চেইন বোনাসের লোভই মূলত তাদের প্রধান টোপ। যার ফাঁদে পড়ে একজন সদস্য নিজের টাকা তুলতে গিয়ে আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব-এমনকি পাড়া প্রতিবেশীদেরও এই ফাঁদে টেনে আনেন। পকেটে টাকা না থাকলে ধারদেনা করে নিয়ে আসেন। অনেকে ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়েও বিনিয়োগ করছেন।

ভুয়া প্রজেক্টের আড়ালে বিনিয়োগের ফাঁদ : টিকে থাকার জন্য এমএলএম কোম্পানিগুলোকে কোনো না কোনো অবাস্তব বা কাল্পনিক প্রজেক্টের গল্প তৈরি করতে হয়। অতিথি ডটকম মূলত ‘ভবিষ্যতের ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং ‘স্মার্ট বিজনেস’র স্লোগান দিয়ে মানুষকে প্রজেক্টের লোভ দেখায়। তারা বলে যে, কেউ যদি অতিথি ডটকম অ্যাপের মাধ্যমে কোনো হোটেল, গাড়ি বা বিমান টিকিট বুক করে, তবে তিনি বাজারের চেয়ে অর্ধেক দামে পাবে এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি বড় অঙ্কের ‘ক্যাশব্যাক’ বা মুনাফা পাবে। পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডার বা পার্টনারশিপের লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বলা হচ্ছে-কেউ যদি নির্দিষ্ট প্রজেক্টে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেন, তবে তিনি কোম্পানির একজন ‘শেয়ারহোল্ডার’ বা ‘কো-ওনারশিপ’ হয়ে অন্তর্ভুক্ত হবেন। একই সঙ্গে কোম্পানির প্রতি মাসের মোট লভ্যাংশ থেকে একটা নির্দিষ্ট অংশ তার অ্যাকাউন্টে চলে যাবে।

তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্য সূত্রে জানা গেছে, ‘অতিথি ডটকম’ বর্তমানে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রজেক্ট সামনে রেখে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে। এই প্রজেক্টগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘স্মার্ট হোটেল ও রিসোর্ট বুকিং প্রজেক্ট’।