সড়কের ভাঙাচোরা অংশে চলতে গিয়ে অটোরিকশার বারবার ঝাঁকুনিতে আসন থেকে পড়ে গিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এক যাত্রী। মুহূর্তের উত্তেজনায় শুরু হয় তর্ক, পরে হাতাহাতি। শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষোভই রূপ নেয় নির্মম হত্যাকাণ্ডে।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক কিশোর সাকিবুল (১৬) হত্যার ঘটনায় এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

ঘটনার আট দিন পর হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন করে মূল অভিযুক্ত আসাদুজ্জামান আসাদ (৩৪) কে গ্রেফতার করেছে পিবিআই। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যার ঘটনা স্বীকার করে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে পিবিআই মানিকগঞ্জ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার জয়িতা শিল্পী।

গ্রেফতার হওয়া আসাদুজ্জামান আসাদ সিংগাইর উপজেলার জামশা ইউনিয়নের গোলাই নতুনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তিনি তিন সন্তানের জনক এবং সাভারের একটি হোটেলে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

নিহত সাকিবুল মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বেতিলা-মিতরা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের রহমত আলীর ছেলে।

পিবিআই জানায়, বুধবার (৮ জুলাই) সন্ধ্যায় সাভার উপজেলার হেমায়েতপুরের যাদুরচর আয়েশা আক্তার মাদরাসা গেট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

তদন্তে জানা গেছে, গত ৩০ জুন কর্মস্থল থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন আসাদ। পথে বৃষ্টির কারণে তিনি মিতরা বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি ফার্মেসিতে অপেক্ষা করেন। পরে বৃষ্টি কমলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে কিশোর সাকিবুলের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে গোলাই নতুনপাড়া যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন।

পথের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ভাঙাচোরা থাকায় অটোরিকশায় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি লাগে। এতে আসাদ বিরক্ত হয়ে সাকিবুলকে ধীরে গাড়ি চালাতে বলেন। একপর্যায়ে ঝাঁকুনিতে তিনি আসন থেকে পড়ে গেলে ক্ষিপ্ত হয়ে পেছন থেকে সাকিবুলকে থাপ্পড় মারেন। এতে অটোরিকশাটি রাস্তার পাশের গাছে আটকে যায়।

পরে সাকিবুল গাড়ি থেকে নেমে আসাদকে গালিগালাজ করেন। দুজনের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা ও হাতাহাতি শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা রাস্তার পাশের পাটক্ষেতে পড়ে যান। তখন আসাদ সাকিবুলকে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারেন। এসময় সাকিবুল চিৎকার করলে তাকে কাদার মধ্যে উপুড় করে চেপে ধরেন। এতে সাকিবুলের মুখে কাদা ঢুকে শ্বাসরোধ হতে থাকে। এরপর আসাদ তার পিঠের ওপর বসে ঘাড়ে চাপ প্রয়োগ করলে একপর্যায়ে সাকিবুল নিস্তেজ হয়ে মারা যায়। ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় আসাদের এক পায়ের স্যান্ডেল সেখানে পড়ে থাকে।

পিবিআই জানায়, সাকিবুলের বাবা রহমত আলী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করতেন। জ্বরে আক্রান্ত থাকায় তিনি সাতদিন অটোরিকশা চালাতে পারেননি। তাই গত ৩০ জুন বিকেল ৩টার দিকে বাবার অটোরিকশা নিয়ে বের হয় সাকিবুল। এরপর থেকেই সে নিখোঁজ ছিল। পরদিন ১ জুলাই সিংগাইর উপজেলার জামশা ইউনিয়নের গোলাই নতুনপাড়া এলাকার একটি পাটক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ২ জুলাই বিকেলে নিহতের বাবা রহমত আলী সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

তদন্তের বিষয়ে পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার জয়িতা শিল্পী বলেন, ‘তদন্তের শুরুতেই মিতরা বাসস্ট্যান্ড এলাকার একটি সিসিটিভি ফুটেজে সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। পরে তার নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা হয়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালিয়ে সাভারের জাদুরচর এলাকা থেকে আসাদকে গ্রেফতার করা হয়।’

তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসাদ ব্যক্তিগত ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছেন। তাকে আদালতে হাজির করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মো. সজল আলী/কেজে/জেআইএম