সবুজ মাঠে ফুটেছিল হলুদ ফুল। গ্যালারিজুড়ে ৮০ হাজার সূর্যমুখী। যেদিকে তাকাই সেদিকেই হলুদ। যেন গোটা ব্রাজিল চলে এসেছিল নিউইয়র্ক নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। মুহুর্মুহু স্লোগান-ব্রাজিল, ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসরা তখন ফিরিয়ে এনেছেন ‘জোগো বোনিতো’। সুন্দর ফুটবল। কিন্তু পৃথিবী এখন নিষ্ঠুর ফুটবলের পূজারি! সেই ফুটবলই খেলল নরওয়ে। আর ব্রাজিল সুন্দর ফুটবলের আরাধনায় নিমগ্ন হয়ে ভুলে গেল যে, এমন ম্যাচে ‘আধভেজা প্রহরের’ মতো আধখানা সুযোগ কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। ১৩ মিনিটে ব্রুনো গিমারেসের পেনালটি মিস একটা বড় ধাক্কা হয়ে এলো ব্রাজিলের জন্য। এই ম্যাচের চিত্রনাট্যকার কি তখনই প্লট বদলানোর সিদ্ধান্ত নেন? আনচেলত্তি কেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের বদলে গিমারেসকে পেনালটি নিতে দিলেন? সেলেসাওদের শেষ ষোলোর স্বপ্নের সেখানেই সমাধি হয়। সেই সমাপ্তি সকরুণ হয়ে উঠল নেইমারের বিদায়ে। শেষ বাঁশি বাজার পর তার কান্না দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

পাহাড়ের কান্না যেমন ঝরনা হয়ে যায়, হলুদের বন্যাও তেমন খরা হয়ে গেল। ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্তে ১১ মিনিটের ব্যবধানে চিত্রনাট্যকার আর্লিং হলান্ডকে এমন দুটি দামি দৃশ্য দিলেন যে, নিউইয়র্ক থেকে ৩,৫৫০ মাইল দূরে হলান্ডের জন্মভূমি নরওয়ের ব্রাইনেতে আনন্দের ফল্গ–ধারা বয়ে যায়। আর গোটা ব্রাজিল ডুব দেয় শোকের সমুদ্রে। বিশ্বকাপ এলে যে দেশের প্রতিটি বাড়ির দরজা-জানালার পর্দা, বিছানার চাদরের রং হয়ে যায় হলুদ, রোববার রাতে শেষ ষোলোতে থামতেই ব্রাজিলের কান্নার রং হয়ে যায় হলুদ। আকাশের তারাগুলোও হয়তো সেই রং দেখে অবাক-এ কোন ব্রাজিল।

শেষ ১১ মিনিটে হলান্ডের দুটি গোল শেল হয়ে বিঁধল ব্রাজিলের বুকে। ৭৯র পর ৯০। বাগানের সব হলুদ ফুল ঝরে গেল। ঘড়ির কাঁটা দৌড়াচ্ছে। বিশ্বকাপে ব্রাজিল-বিয়োগের আরেকটি বেদনাবিধুর ক্ষণ উপস্থিত। আহা রে বিশ্বকাপ! আহা রে ফুটবল! যে দেশে সূর্যাস্ত হয় মধ্যরাতে, সেই নরওয়ে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সূর্য অস্তাচলে নিয়ে গেল। ১১ মিনিটের ব্যবধানে হলান্ডের হাতে দুবার ‘খুন’ হয়ে ব্রাজিল যখন আরেকটি স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় বিলীন, চিত্রনাট্যকারের তখন একটু মায়া হয়। তাই বুঝি নেইমারকে দিয়ে যোগ করা সময়ের ১০ মিনিটে পেনালটিতে একটি গোল করালেন। ব্রাজিল-১, নরওয়ে-২। নেইমার, যিনি মাত্র ২৩ মিনিট সুবজ গালিচার আতিথ্য গ্রহণ করে একটু পরে মিক্সড জোনো বলবেন, ‘ইটস ওভার। এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শুরু করেছিলাম। শেষও করলাম এখানে। এবার বিদায় দিন।’

মেটলাইফে এদিন দুটি সূর্য ডুবল। এক, দীর্ঘ ২৪ বছরের খরা ঘোচানোর সুতীব্র আকাঙ্ক্ষার আবারও জলাঞ্জলি দিতে হলো পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের। দুই, ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৮০) নেইমার বলে দিলেন-আদেউস (পর্তুগিজ ভাষায় বিদায়)। টানা ষষ্ঠবার ইউরোপের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ‘জোগো বোনিতো’র দেশ। শেষবার ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছিল ৩৬ বছর আগে। সেবার তারা শেষ ষোলোতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যায় ১-০ গোলে। এবার হলান্ডের নরওয়ে ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়। এই বিশ্বকাপের আগে শেষ আট আসরের প্রতিটিতে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল অবধি খেলেছে ব্রাজিল। এবারই তার ব্যত্যয় হলো। তা-ও এমন এক কোচের অধীনে, যার ওপর ব্রাজিল আস্থা রেখেছিল ‘হেক্সা’ (ষষ্ঠ) শিরোপা জয়ের জন্য।

আর হলান্ড, জোড়া গোলে যিনি ছুঁয়ে ফেললেন লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে (তিনজনেরই এখন সমান সাতটি করে গোল)-ম্যাচ শেষে তার অকপট স্বীকারোক্তি, ‘পাগলামির একটা দিন কাটল। নরওয়ের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে পাগলামির দিন।’ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালেও এমন একটা পাগলামির দিন চাইবে নরওয়ে।

নান্দনিক ফুটবলের পসরা সাজিয়ে ব্রাজিল শুরু করেছিল শেষ আটে খেলার স্বপ্ন সত্যি করতে। বক্সে মাতেউস কুনিয়াকে নরওয়ের ক্রিস্টোফার আজের ফেলে দিলে পেনালটি পায় ব্রাজিল। রেফারি প্রথমে তাতে সাড়া দেননি। দিতে বাধ্য হন ভিএআরের জন্য। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভিনির বদলে স্পটকিক নিতে যান নিউক্যাসলের মিডফিল্ডার গিমারেস। আর কী আশ্চর্য, পেনালটি রুখে দিলেন। ভিনিকেও পরে হতাশ করেছেন নিল্যান্ড। আরও বারদুয়েক তার সেভ নরওয়েকে বাঁচিয়েছে। ৬৭ মিনিটে নেইমার বদলি হিসাবে মাঠে নামেন গ্যালারির গর্জন সঙ্গী করে। কিন্তু ৭৯ মিনিটে হেডে এবং ৯০ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে হলান্ডের শট জাল খুঁজে পেলে ব্রাজিলের আশা শেষ হয়ে যায়। একেবারে অন্তিমলগ্নে নেইমারের পেনালটি-গোল ব্রাজিলের জন্য সান্ত্বনা হয়ে আসে। ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে হলুদ জার্সিতে ৮০ গোলের স্মৃতি নিয়ে অশ্রুভেজা বিদায় নেন নেইমার।