বাংলার বর্ষা মানেই মেঘ, বৃষ্টি আর ঝুমকো লতার দোলা। বাড়ির বেড়া, আঙিনা কিংবা গ্রামীণ পথঘাট- সবখানেই যেন সবুজ লতার মাঝে দোল খায় রক্তিম, বেগুনি, সাদা আর নানা রঙের এই ফুল। এর সৌন্দর্য এতটাই গভীর যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পর্যন্ত লিখেছেন—‘ঝুমকো-লতার চিকন পাতায়হেরেছি তোমার লাবনি প্রিয়া।মহুয়া-ফুলের মদির গন্ধেতোমারই মুখ-মদের অমিয়া।’আবার শিশুমনের কৌতূহলী চোখে এক কবি লিখেছেন—‘ঝুম্কো লতায় জোনাকি—মাঝে মাঝে বিষ্টি গো।আবল তাবল বকে কেতারও চেয়ে মিষ্টি গো।’শুধু সৌন্দর্য নয়, এই ফুল যেন ধরে রেখেছে এক অনন্য ইতিহাস ও পুরাণের গাঁথা। খ্রিস্টান ধর্মমতে ফুলের দশটি পাপড়ি দশ প্রেরিতের প্রতীক। পাঁচটি পুংকেশর যিশুর পাঁচটি ক্ষতের প্রতীক। কাঁটার মতো আঁশগুলো যিশুর মাথায় দেওয়া কাঁটার মুকুট। অন্যদিকে হিন্দু পুরাণে একে ‘পাঁচপাণ্ডব’ বা ‘কৃষ্ণকমল’ বলা হয়। ফুলের ১০০টি আঁশ হলো ১০০ কৌরব। ভেতরের পাঁচটি অংশ পাঁচ পাণ্ডব। আর মাঝের অংশ শ্রীকৃষ্ণ বা তার সুদর্শন চক্র। এই রূপ আর গল্পের কারণেই ঝুমকো লতা হয়ে উঠেছে এক অনন্য ঐতিহ্যের প্রতীক।ঝুমকো লতার ফুলপ্যাসন ফ্লাওয়ার বা ঝুমকো লতার আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল- ব্রাজিল, পেরু, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। প্রায় ১৫ শতক থেকেই আদিবাসীরা এটি চিনত এবং ভেষজ ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করত।১৫৬৯ সালে স্পেনীয় চিকিৎসক নিকোলাস মোনার্দেস পেরু ভ্রমণে এই ফুল আবিষ্কার করেন। ফুলটির গড়নে তিনি যিশুর মৃত্যুদণ্ডের যন্ত্রণার প্রতীক দেখতে পান, তাই নাম দেন ‘প্যাসন ফ্লাওয়ার’। ১৬০৯ সালের দিকে এটি ইউরোপে শোভাবর্ধনকারী গাছ হিসেবে পৌঁছে। প্রায় ২০০ বছর পর ব্রিটিশ বণিক ও মিশনারিরা এটি নিয়ে আসেন ভারতবর্ষে।বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ফুলটি এসেছে উনিশ শতকের শুরুর দিকে। ব্রিটিশ আমলে কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রথম লাগানো হয়। পরে গ্রামের বাড়ির আঙিনায়, বেড়ায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০-৬০ এর দশকে বাংলার বর্ষা মানেই এই ফুলের অন্যরকম উপস্থিতি ছিল। বর্ষার সকালে দেখা যেত ঝুমকো লতায় ভিজে পাতা আর ফুলের ছড়াছড়ি।বাংলাদেশে এখনো টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, পাবনা, নাটোর, যশোর, কুষ্টিয়া, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে এই ফুলের দেখা মেলে। শহরাঞ্চলে অবশ্য এখন খুব কম দেখা যায়। তবে পুরনো ঢাকার কিছু বাড়ির বারান্দায় সচেতন ফুলপ্রেমীরা এখনো টবে ঝুমকো লতা লাগান।আধুনিক গবেষণায় ঝুমকো লতার ভেষজ গুণ প্রমাণিত। এটি প্রাকৃতিক ঘুম ও প্রশান্তির ওষুধ। ইউরোপ ও আমেরিকায় অনিদ্রার চিকিৎসায় এটি বহুল ব্যবহৃত। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কাজের চাপে ঘুম হারাচ্ছেন, তাদের জন্য এটি ক্যামোমাইলের চেয়েও কার্যকরী।এ ছাড়া এটি উদ্বেগ ও অস্থিরতা কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং ঋতুবেদনা কমাতেও কাজ করে। প্যাসন ফ্লাওয়ার এক্সট্র্যাক্ট সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে মেজাজ ভালো রাখে।যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে প্যাসন ফ্লাওয়ার ঘুমের ওষুধের বাজারের আকার প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশ্ববাজারে প্যাসন ফ্লাওয়ার এক্সট্র্যাক্টের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। টিংচার, ক্যাপসুল, পাউডার, চা, সিরাপ—সব পণ্যই বানানো যায়। প্রসাধনী, শ্যাম্পু, তেল, ফেস প্যাকেও ব্যবহার হয়। এমনকি আইসক্রিম, কোমল পানীয়, দই, স্মুদি ও জুস তৈরিতেও ফুল ও ফলের নির্যাস ব্যবহার হয়।হেরেছি তোমার লাবনি প্রিয়াঅথচ বাংলাদেশে এখনো ঝুমকো লতার বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়নি। প্রতিটি গ্রামের আঙিনায় বিনা পরিচর্যায় যে ফুল ফোটে, সেই ফুল থেকে বিদেশি কোম্পানিগুলো কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে, অথচ আমরা চিনিও না ফুলটির প্রকৃত মূল্য।কবি নজরুল যেমন ঝুমকো লতাকে প্রেমিকার লাবণ্যের প্রতীক করেছেন, তেমনি শিশুরাও জোনাকির সঙ্গে ভেজে দিয়েছে এই ফুলকে। এই ফুল শুধু সৌন্দর্যই নয়, এটি এক অনন্য ভেষজ সম্পদ, সম্ভাবনাময় একটি ফসল। বর্ষার এই ফুল ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি- আঙিনায়, ঘরে, আর শিল্পের কারখানায়।
রাজনীতি
ঝুমকো-লতার চিকন পাতায়

শেয়ার করুন







