গাইবান্ধায় ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি শহর রক্ষা বাঁধের শতাধিক স্থানে বড় ফাটল ও ধসের সৃষ্টি হয়েছে। এতে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে বন্যার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন গাইবান্ধা পৌরবাসীসহ জেলার বাসিন্দারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধের অসংখ্য স্থান এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ। নদী ও বাঁধের মধ্যবর্তী দূরত্ব কিছু কিছু পয়েন্টে কমে মাত্র দুই থেকে আড়াই ফুটে দাঁড়িয়েছে। বাঁধের বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে বিরাট গর্ত, যেখানে শিশুদের খেলাধুলা করতে দেখা যায়। আবার অনেক স্থানে দেখা দিয়েছে গভীর ফাটল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘাঘট তীরজুড়ে বেলে-দোআঁশ মাটি দিয়ে নির্মিত হয়েছে শহর রক্ষা বাঁধটি। ফলে কয়েকদিনের ভারী বৃষ্টিতে বাঁধের বিভিন্ন অংশে মাটি সরে গিয়ে বড় ফাটল তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেসব ফাটল বা গর্ত সংস্কারে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থায়ী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
ঘাঘট নদী তীরের ডেভিড কোম্পানি পাড়ার স্থানীয় বাসিন্দা জুয়েল মিয়া। তিনি জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি হলেই শহর রক্ষা বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়ে। দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশে টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে।
একই এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “প্রতিবার বৃষ্টি হলেই বাঁধের মাটি সরে যায়। মনে হয় বাঁধটা ধীরে ধীরে নদীর দিকে গলে যাচ্ছে। বড় বৃষ্টি হলে কী হবে, সেটা নিয়েই চিন্তা।”
সরকার পাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ রাবেয়া বেগম বলেন, “২০১৯ সালে এই বাঁধ ভাঙার কারণেই পুরো শহর বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। আমরা চাই না, এমন দিন আর ফিরে আসুক। কিন্তু এভাবে যদি ভাঙন বাড়তে থাকে, তাহলে যেকোনো সময় পানি শহরে ঢুকে পড়তে পারে। রাতের বেলা বেশি ভয় লাগে, মনে হয় কখন জানি বাঁধ ভেঙে যায়।”
পশ্চিম কোমরনই এলাকার বাসিন্দা সিফাত মিয়া বলেন, “বাঁধটা মূলত বালুর মতোই। একটু বৃষ্টি হলেই পানির স্রোতে মাটি খসে যায়। ঠিকাদার এসে কিছু স্থানে কয়েকটা বালুর বস্তা ফেলে গেছে, কিন্তু বেশিরভাগ ধস মেরামতে কোনো শক্ত সুরক্ষা নেই।”
শহর রক্ষা বাঁধের কুটিপাড়া এলাকার বাসিন্দা আকবর আলী, সোবহান মিয়া, ইমরান মিয়া জানান, “অধিকাংশ ধস মেরামতে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছেনা। কিছু স্থানে লোক দেখানোর জন্য বালুর বস্তা জড়ো করে রাখা হয়েছে। ডিসি সাহেব এসে দেখার পরে ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বললেও তারা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই বাঁধ যদি একবার ভেঙে যায়, তাহলে ঘাঘট নদীর পানি ঢুকে গোটা শহর ভাসিয়ে দিবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা শহর রক্ষা বাঁধটির দৈর্ঘ ২৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার। বাঁধটি জেলার সাদুল্লাপুর উপজেলা থেকে শুরু করে সুন্দরগঞ্জ ও সাঘাটা উপজেলা পর্যন্ত বিস্তৃত। দীর্ঘ এই বাঁধের ঠিক কত অংশে ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে, এর স্পষ্ট কোন ধারণা নেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবোর এক কর্মকর্তা স্বীকার করেন, নকশাজনিত ত্রুটি, বালিমাটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণ ও অতিবৃষ্টির কারণেই মূলত এই ফাটল ও ধস। সময়মতো তাৎক্ষণিক সমাধান না করা গেলে ভবিষ্যতে এটি আরো বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, “বাঁধের কিছু অংশে রেইন কাট ও ক্ষয় দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঠিকাদারের মাধ্যমে খুব দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী জিওব্যাগ ও বালুর বস্তা ফেলা হচ্ছে। কাজ ভালোভাবে বুঝিয়ে নিয়েই বিল ছাড় করা হবে।”
সম্প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ শহররক্ষা বাঁধ এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা।
পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে নদীভাঙনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত হন। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
সম্প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন গাইবান্ধা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা। পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, “বাঁধের গর্ত ও ফাটল সৃষ্টি হওয়া স্থানে গুণগত মান বজায় রেখে সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাজের ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”








