কক্সবাজারের সুনীল সমুদ্রসৈকতের যে রুপালি বালু মাড়িয়ে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক মুগ্ধতায় ঘুরে বেড়ান, তার বুকেই লুকিয়ে আছে এক অতীব মূল্যবান এবং কৌশলগত অর্থনৈতিক শক্তি। সোমবার যুগান্তরের এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ-দেশের উপকূলের ১৭টি স্থানে ছড়িয়ে আছে কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের মহামূল্যবান খনিজসম্পদ জিরকনসহ বিভিন্ন ভারী আকরিক। মহাকাশ প্রযুক্তি, জেট ইঞ্জিন, পারমাণবিক চুল্লি, সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জামের মতো উচ্চপ্রযুক্তির বৈশ্বিক শিল্পে জিরকনের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। আশার কথা, গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলে প্রাপ্ত জিরকনের বিশুদ্ধতা প্রায় ৯৬ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। অথচ স্বাধীনতার এত বছর পরও এই মহামূল্যবান জাতীয় সম্পদ রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার অভাব, চরম অবহেলা এবং আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতার বেড়াজালে আটকা পড়ে সৈকতের বালুতেই অপচয় হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

জানা যায়, ১৯৯৫ সালে কক্সবাজারে খনিজ বালু পৃথক্করণের একটি পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছিল; কিন্তু রহস্যজনকভাবে পাঁচ বছর পর সেই সম্ভাবনাময় প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে কক্সবাজার সৈকত খনিজ বালু আহরণকেন্দ্র (বিএসএমইসি) যে বেহাল হয়েছে, তা এককথায় লজ্জাজনক। ৮০ জনের অনুমোদিত জনবল কাঠামোর বিপরীতে কেন্দ্রটি চলছে মাত্র চারজন কর্মী দিয়ে, যার মধ্যে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার অভাব প্রকট এবং গবেষণাগারের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিনের অযত্নে ধ্বংসের মুখে। যেখানে অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের একাধিক উন্নত দেশ এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ খাতে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে বারবার দ্বারস্থ হয়েছে, সেখানে কোনো এক অজানা কারণে বিগত সরকারগুলো এই অপার সম্ভাবনাকে পুরোপুরি এড়িয়ে গেছে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় ও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে-কেন বিগত সরকারগুলো এই অতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ আহরণে এত উদাসীন ও অনীহা প্রকাশ করেছিল? এর একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া আজ সময়ের দাবি।

আমরা মনে করি, এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আর বালির নিচে চাপা পড়ে থাকতে দেওয়া উচিত নয়। সংকট মোচনে এবং খনিজসম্পদকে দেশের অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করতে সরকারকে অবিলম্বে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক প্রযুক্তির সাহায্যে প্রকৃত মজুতের পরিমাণ ও সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিতকরণের জন্য করতে হবে নতুন জরিপ। এজন্য কক্সবাজারের বালু আহরণ কেন্দ্রটিকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে অবিলম্বে কার্যকর সংস্থায় রূপান্তর করতে হবে। এছাড়া দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য ও উপকূলীয় পর্যটন খাতের ক্ষতি না করে কীভাবে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ভারী খনিজ উত্তোলন করা যায়, তার একটি শক্ত নীতিমালাও প্রণয়ন করা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-কোনো প্রকার স্বার্থান্বেষী মহলের ফাঁদে না পড়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক টেন্ডার বা যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে হবে।

আমরা আশা করব, সরকার বিগত আমলের সব নিষ্ক্রিয়তা ও উদাসীনতার দেওয়াল ভেঙে এই খনিজ বিপ্লবের সূচনা করবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং লাখো বেকার যুবকের কর্মসংস্থানে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।