চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের ঘটনা এখনো এ দেশের মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। স্বজন হারানো পরিবারগুলোর চোখ আজও অশ্রুসজল, আহতদের ক্ষত এখনো শুকায়নি। এমন একটি সংবেদনশীল সময়ে, যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনার ধারক শক্তি বিদ্যমান, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে কিছু ব্যক্তির অবমাননাকর মন্তব্য পরিস্থিতিকে নতুন করে ঘোলাটে করে তুলছে। বলা বাহুল্য, এ ধরনের অপতৎপরতা যে কেবল সাধারণ মানুষকে আহত বা ক্ষুব্ধ করছে তা-ই নয়, এটি জুলাইয়ের বীর শহীদ ও আহতদের নজিরবিহীন ত্যাগের প্রতি ধৃষ্টতাও বটে। ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানকে সাজানো ঘটনা হিসাবে প্রমাণের অপচেষ্টায় জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে, যা স্বাভাবিক। বাংলাদেশের আলো-বাতাস গ্রহণ করে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে এ ধরনের নোংরামি ও স্পর্ধা কোনোভাবেই বরদাশত করার সুযোগ নেই।
উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাই নিয়ে এমন প্রকাশ্য কটূক্তি ও উসকানিমূলক অপপ্রচারের পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কোনো দৃশ্যমান তৎপরতা বা কঠোর পদক্ষেপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। কটূক্তিকারী অন্তত ৯ জনের বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় দুটি সুনির্দিষ্ট সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এর তদন্ত প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক ধীরগতির জালে আটকে আছে। জুলাই আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। সেই আন্দোলনের চেতনাকে যারা আঘাত করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যদি পুলিশকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া কিংবা ‘উচ্চপর্যায়ের গ্রিন সিগন্যালের’ অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে তা চব্বিশের চেতনাকেই দুর্বল করে তোলে। এমন বাস্তবতায় এই গড়িমসি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এই অস্থিরতা ও জনক্ষোভ প্রশমন করতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কঠোর ও আপসহীন ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ফাইল চালাচালির সংস্কৃতি ভেঙে অনতিবিলম্বে ডিএমপির ডিবি সাইবার বিভাগকে বিষয়টির নিখুঁত ও দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দেওয়া প্রয়োজন বলে বিশ্লেষকরা অভিমত দিচ্ছেন, যা যৌক্তিক। এছাড়া ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যারা সুপরিকল্পিতভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে, তাদেরও দ্রুততম সময়ে আইনি প্রক্রিয়ার ভেতর আনা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে মানবতাবিরোধী অপরাধের সহযোগী বা উসকানিদাতা হিসাবে এই অপপ্রচারকারীদেরও ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো প্রয়োজন।
আমরা মনে করি, অপরাধীদের এই বার্তাটুকু স্পষ্টভাবে দেওয়া দরকার যে, বাক্স্বাধীনতার আড়ালে হাজারো শহীদের আত্মত্যাগকে খাটো করার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। ভুলে গেলে চলবে না, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার পণ্য নয়, এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রতীক। স্বজনহারাদের চোখের পানি শুকানোর আগেই যারা এই আত্মত্যাগীদের প্রশ্নবিদ্ধ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছে, ইতিহাস তাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। সরকার কোনো প্রকার শৈথিল্য না দেখিয়ে দ্রুততম সময়ে এই অপপ্রচারকারী ও ফ্যাসিবাদের দোসরদের মুখোশ উন্মোচন করবে এবং শহীদদের রক্তের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবে-এটাই দেশবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।








