জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণ এবং তাদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে রাজধানীতে আয়োজিত হয়েছে জুলাই জাতীয় সম্মেলন। এতে শহীদ পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বিচার, জুলাই স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করার দাবি জানান। আহত যোদ্ধারা তুলে ধরেন নিজেদের বঞ্চনার কথা।

শনিবার (৪ জুলাই) আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সম্মেলন হয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে আয়োজিত সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণে এই আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের মূল মঞ্চের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা ৪ জুলাইয়ের এই দিনে হোক সবার অনুপ্রেরণা, যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এতে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পেশাজীবী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সম্মেলনে অংশ নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘আমার ছোট ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার আত্মত্যাগ সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছিল রাজপথে নামার জন্য। জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা অনেকেই (পরিবারের) একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার আর্জি জানাচ্ছি।’

জুলাই জাতীয় সম্মেলন: বিচার ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের দাবি শহীদ পরিবারের

ভাইয়ের হত্যা মামলার রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘জুলাই স্মৃতিস্মারক সংরক্ষণ করার আর্জি জানাচ্ছি। এই স্মৃতিগুলোই আমাদের শক্তি।’

নিহত ১৫ বছর বয়সী আলভীর বাবা আবুল হাসান বলেন, ‘সন্তানের বিচারের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচারের নামে একধরনের প্রতারণা করেছে। এখন আমরা বর্তমান সরকারের কাছে একটি দৃশ্যমান ও সুষ্ঠু বিচারের প্রত্যাশা করছি।’

বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিক আলম। তিনি বলেন, ‘আদৌ আমরা সন্তান হত্যার বিচার পাবো কি না, তা জানি না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে চাই, একজন সন্তান হত্যার বিচার হলেও আমরা শান্তি পাবো।’

শহীদ মিরাজের বাবা আব্দুর রব মিয়া জুলাই স্মৃতিফলক সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমার ছেলে তার মোবাইল দিয়ে ভিডিও করছিল, এটাই তার অপরাধ ছিল। শুধু জুলাই না, শাপলা চত্বর ও পিলখানা হত্যারও বিচার করতে হবে। জুলাই শহীদদের কবরের নামফলক তৈরির জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ঘুরে আমাদের হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাই স্মৃতিফলকগুলো অবহেলায় রয়েছে। যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেখানে জুলাই শহীদদের নাম লেখা আছে, তার সম্মান যেন বজায় থাকে।’

স্মরণ অনুষ্ঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহীদ আবদুল্লাহ জামিলের মা ফাতেমা তুজ জোহরা বিগত দিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বড় ছেলে ৫ আগস্ট শহীদ হয়। এরপর আমার ১৩ বছরের ছোট ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং আমার স্বামীও মারা যান। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে যথাযথ সাহায্য পাই নাই। যাদের ডাকে আমরা সাড়া দিয়েছিলাম, তারা কেউ আমাদের কাছে আসে নাই। তবে ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও তারেক রহমান সবসময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।’

জুলাই জাতীয় সম্মেলন: বিচার ও স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের দাবি শহীদ পরিবারের

অনুষ্ঠানে আহত যোদ্ধারাও নিজেদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। ছাত্রদল কর্মী ও জুলাই যোদ্ধা মিল্লাত হোসেন বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত আমরা বিএনপি কর্মীরা কেউ পরিপূর্ণ চিকিৎসা পাইনি। আমরা ছাত্রদলের কর্মী হওয়ায়, ভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ের কারণে আমাদের গেজেটে নাম ওঠানো বা মূল্যায়ন করা হয়নি।’

অনুষ্ঠানে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্রদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী সরকার উৎখাতের আন্দোলনে রূপ নেয়। ৩৬ দিনের সেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

আন্দোলন দমাতে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গুলি, টিয়ারশেল ও বলপ্রয়োগ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে ফেসবুক এবং পরে ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হলেও আন্দোলন থামেনি। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রক্তপাত শুরুর ২০ দিনের মাথায় পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের।

সরকার প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৪ জন। তবে অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

কেএইচ/একিউএফ