বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীদের সংগঠন বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিল দাবি করেছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর অনুচ্ছেদ ৭ অনুযায়ী অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত।
সংগঠনটির দাবি, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশই গণঅভ্যুত্থানের আইনি দলিল এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ের একমাত্র লিখিত আইনগত প্রকাশ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বর্তমানে কার্যকর আইন এবং সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বাধ্যতামূলক। সংগঠনটি আরও বলেছে, বাংলাদেশের কোনো আদালত এখন পর্যন্ত এ আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেনি।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে আয়োজিত ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি, গণভোট, জুলাই সনদ ও পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়: বর্তমান বাস্তবতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
আরও পড়ুন
জুলাই জাতীয় সনদের অঙ্গীকারনামায় যা আছে
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ লইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি জসিম উদ্দিন সরকার, সেক্রেটারি জেনারেল মতিউর রহমান আকন্দ, এএসএম শাহরিয়ার কবির, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান তাসমিয়া প্রধান, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিব মোমেন এবং এবি পার্টির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তাজুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন ও গণভোটের আইনি ভিত্তি নিয়ে দাবি
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির। তিনি দাবি করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের একমাত্র আইনি ভিত্তি ছিল জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংবিধানে ওই সময় নির্বাচন বা গণভোট আয়োজনের সুনির্দিষ্ট লিখিত বিধান না থাকায় এই আদেশে নির্ধারিত সংজ্ঞা ও সময়কালই নির্বাচনের আইনগত ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, এই আদেশের বাইরে ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানের অন্য কোনো আইনি ভিত্তি ছিল না।
বিদেশি উদাহরণ টানলেন শিশির মনির
শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ফিলিপাইন, গ্রানাডা ও লেসোথোর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মিল রয়েছে, যেখানে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। তার দাবি, সেসব দেশের সুপ্রিম কোর্টও মত দিয়েছিল যে, গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা বা অবৈধতার প্রশ্ন আদালতের বিচার্য নয়; বরং জনগণই এ বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারক।
জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতেই জুলাই সনদ
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে প্রস্তাবিত সংস্কারের বিষয়ে জনগণের সরাসরি সমর্থন নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজন করা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেট অর্জন এবং সেগুলোর আইনগত ভিত্তি আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনে আইনি বাধা নেই
প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টাদের শপথের প্রসঙ্গ তুলে শিশির মনির বলেন, বর্তমান সংবিধানে এ ধরনের শপথের বিধান নেই। তার মতে, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও অভিপ্রায়ই এ ক্ষেত্রে আইনগত বৈধতার উৎস।
আরও পড়ুন
দুই বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি আবু সাঈদের জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প
তিনি আরও বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হলেও আদালত কেবল রুল জারি করেছেন; কোনো স্থগিতাদেশ বা অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেননি। তাই তার মতে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং সদস্যদের শপথ গ্রহণে বর্তমানে কোনো আইনি বাধা নেই।
সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে শিশির মনির অভিযোগ করেন, সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা বর্তমান সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটের বিধান অনুসারে সংসদ সদস্যদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি।
আরও পড়ুন
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সব রাজনৈতিক দল অঙ্গীকারবদ্ধ: সুজন
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারের পক্ষ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-কে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে এবং মানবাধিকার কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, যদিও সরকার এগুলো সংশোধন করে পুনরায় প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
আইনের বৈধতা নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের
শিশির মনির অভিযোগ করেন, জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আইনের বৈধতা বা অবৈধতা নির্ধারণ এবং আইনের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যা তার মতে ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থী।
তার বক্তব্য, কোনো আইন সংবিধানসম্মত কি না, তা নির্ধারণের একমাত্র এখতিয়ার উচ্চ আদালতের। অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো আইনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে পারে না।
এফএইচ/এসএইচএস








