জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে মাসব্যাপী চলছে রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা, সংবিধান ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা সভা। কিন্তু একটি বিষয় তুলনামূলকভাবে কম আলোচনায় এসেছে—উচ্চশিক্ষা। আমাদের ক্যাম্পাসগুলো জুলাইয়ের প্রাণকেন্দ্র ছিল এবং থাকবে। কিন্তু তার চেয়ে বড় বাস্তবতা হলো দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম নয়।
বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষা আর কেবল শিক্ষানীতির বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতিরও অংশ। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়। এটি জ্ঞান সৃষ্টি করে, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে এগিয়ে নেয়, রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ায়, শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক করে এবং নীতিনির্ধারণে প্রমাণভিত্তিক সহায়তা দেয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবকাঠামোর অত্যাবশ্যকীয় অংশ।
এ কারণেই শিক্ষাকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ছে। এই বিষয়ে বিএনপি সরকারের অবস্থান প্রশংসার দাবি রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের আলোচনায়ও এ ধারণা ক্রমে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা যদি বিনিয়োগ হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই বিনিয়োগের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফলাফল কী? বিশ্ববিদ্যালয় কি সত্যিই গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করছে, নাকি আমরা এখনো মূলত ডিগ্রি বিতরণেই সীমাবদ্ধ?
জুলাই আমাদের শুধু সরকার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দেয়নি; দিয়েছে নতুনভাবে সমাজ ও অর্থনীতিকে নিয়ে কল্পনা করার সাহস। আর শিক্ষা খাতে সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পুরোনো চিন্তার গণ্ডি ভাঙতে হবে। শিক্ষার অর্থনীতিবিষয়ক নতুন ধারণা, নতুন বিতর্ক এবং নতুন নীতিচিন্তার জন্য জায়গা তৈরি করতে হবে।
এদিক থেকে সাম্প্রতিক রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো ধীরে ধীরে শুধু স্লোগান বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বদলে নীতিনির্ভর প্রতিযোগিতায় আগ্রহী হচ্ছে। নির্বাচন ইশতেহারে এখন লক্ষ্য, সময়সীমা ও অর্থায়নের বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের একদল রাজনৈতিক নেতৃত্ব জাতীয় বিতর্কে যুক্ত হয়েছে, যারা রাষ্ট্র, শিক্ষা, গবেষণা কিংবা অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন তুলছে।
জুলাই প্রজন্মের রাজনীতিকে কীভাবে দেখবএটি গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ। গণতন্ত্রের প্রতিযোগিতা শুধু ভোটের বাক্সে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; ধারণারও প্রতিযোগিতা হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে দুই মাস আগে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের লার্নিং নেশন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের অনুষ্ঠান আমার নজর কেড়েছে। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও আমন্ত্রিত বক্তারা প্রমাণভিত্তিক, কর্মমুখী ও বিনিয়াগবান্ধব শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন।
সম্প্রতি শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনও উচ্চশিক্ষার বিষয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করেছেন যে বাংলাদেশ শিগগিরই হবে বিশ্বের ‘এডুকেশন হাব’। একসময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রচুর শিক্ষার্থী পড়তে আসত। আমরা চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তুলতে। এর ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করতে আরও আগ্রহী হবে। আমাদের লক্ষ্য, এ দেশকে আন্তর্জাতিক ‘এডুকেশন হাব’-এ পরিণত করা।
জুলাই বিপ্লব আমাদের রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। সেই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে উচ্চশিক্ষাকে স্থান দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কার এজেন্ডা কোনো একক রাজনৈতিক দলের প্রকল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ। যদি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা সত্যিই ধারণার প্রতিযোগিতা, উন্মুক্ত বিতর্ক ও প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, তবে সেটিই হবে জুলাইয়ের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার।
এই পরিপ্রেক্ষিতে চলতি সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘জুলাই সম্মেলন’-এ আয়োজিত উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সভাও ছিল উল্লেখযোগ্য। সেখানে সুলতান জাকারিয়ার বক্তৃতাটি আমাকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করেছে। তিনি ১০টি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছেন। তবে শুধু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই এই পরিবর্তন আসবে না। অর্থনীতির একটি মৌলিক শিক্ষা হলো যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ইনসেনটিভ বা প্রণোদনা অনেক সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার অর্থায়ন কীভাবে হবে, শিক্ষক পদোন্নতির মানদণ্ড কী হবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব কীভাবে নির্বাচন হবে এবং জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আচরণ নির্ধারণ করবে।
এ ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। তারা একসঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার চেষ্টা করেনি। বরং পাঁচটি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়কে বেছে নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, শক্তিশালী গবেষণা অনুদানব্যবস্থা এবং সুস্পষ্ট শাসনকাঠামোর মাধ্যমে উৎকর্ষ গড়ে তুলেছে। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দকৃত এই স্ট্যাটাস রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে প্রতিনিয়ত পারফরম্যান্স পরিসংখ্যানের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। শিক্ষা সংস্কারে এবং সরকারি গবেষণার বরাদ্দকৃত বাজেটের সর্বোচ্চ রিটার্ন ও সম্পদের কৌশলগত ব্যবহার নিশ্চিত করা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, এটি তার একটি ভালো উদাহরণ।
ফিরে দেখা ইতিহাসের দীর্ঘতম জুলাইএকইভাবে গবেষণার উৎকর্ষ মানেই শুধু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানো নয়। গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশের সংখ্যায় বাংলাদেশ এখনো পাকিস্তান ও মালয়েশিয়ার মতো দেশের চেয়ে পিছিয়ে। উদ্বেগের বিষয় হলো, গবেষকের সংখ্যার তুলনায় গবেষণা প্রত্যাহারের হারও আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় অসততা কিংবা দুর্বল নৈতিক মান কেবল একাডেমিক সমস্যা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নেরও সমস্যা। বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়া সম্ভব নয়।
এখানে ব্যাংকিং খাতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটি তুলনা করা যায়। দুর্বল সুশাসন, বিকৃত প্রণোদনা ও জবাবদিহির অভাব আমাদের ব্যাংকিং খাতে যেমন বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করেছে, তেমনি উচ্চশিক্ষায়ও যদি কেবল বাহ্যিক সংস্কার, র্যাঙ্কিংয়ের দৌড় কিংবা গবেষণার সংখ্যাগত প্রতিযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, তবে আমরা আরেক ধরনের সংকট তৈরি করব—গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ এই প্রশ্নগুলোকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি সত্যিই জাতীয় ‘এআই হাবে’ পরিণত হতে চায়, তবে শুধু নতুন বিভাগ খুললেই হবে না। উনিশ শতকের আমলাতান্ত্রিক ও কাগজনির্ভর ব্যবস্থাপনায় একবিংশ শতাব্দীর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়া সম্ভব নয়। ডিজিটাল গবেষণা ব্যবস্থাপনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ অনুদান ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি অপরিহার্য।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষার মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন টিকিয়ে রাখার সময় শেষ। গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন দরকার, তেমনি দরকার শক্তিশালী পলিটেকনিক, অ্যাপ্লায়েড বিশ্ববিদ্যালয় এবং আজীবন শিক্ষার সুযোগ। ভবিষ্যতের অর্থনীতি নমনীয় দক্ষতাকে পুরস্কৃত করবে, কঠোর শিক্ষাগত বিভাজনকে নয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো আলোচনার বাইরে রয়ে গেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রত্যাশা করি, তারা সরকার, ব্যবসা ও সমাজের জন্য গবেষণা করবে, তথ্য দেবে, প্রমাণ হাজির করবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই কতটা প্রমাণভিত্তিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে? আমরা কি নিয়মিত জানি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ডিগ্রিধারীদের কর্মসংস্থানের অবস্থা কী? গবেষণার প্রকৃত প্রভাব কতটা? সরকারি অর্থায়নের সামাজিক রিটার্ন কী? শিক্ষার মান, প্রশাসনিক দক্ষতা কিংবা গবেষণার গুণগত মান সম্পর্কে আমাদের নির্ভরযোগ্য তথ্য কোথায়?
আমার মতে, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা সংস্কারের পরবর্তী বড় পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি ‘জাতীয় উচ্চশিক্ষা প্রমাণ ও নীতি গবেষণাগার’ প্রতিষ্ঠা করা। এমন একটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্মক্ষমতা, গবেষণার মান, স্নাতকদের শ্রমবাজারে অবস্থান, উদ্ভাবনের ফলাফল এবং সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সমাজের জন্য প্রমাণ তৈরি করবে—এটি যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়কেও হতে হবে দেশের সবচেয়ে ‘প্রমাণনির্ভর’ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
জুলাই বিপ্লব আমাদের রাষ্ট্রকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। সেই পুনর্গঠনের কেন্দ্রে উচ্চশিক্ষাকে স্থান দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কার এজেন্ডা কোনো একক রাজনৈতিক দলের প্রকল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ। যদি জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশে আমরা সত্যিই ধারণার প্রতিযোগিতা, উন্মুক্ত বিতর্ক ও প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারি, তবে সেটিই হবে জুলাইয়ের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার।
● ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
* মতামত লেখকের নিজস্ব








