গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অধঃপতনের বিরুদ্ধে ভারতের তরুণ শিক্ষার্থীরা যে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেছেন, তা ক্রমেই গতি পাচ্ছে। তাঁদের দাবি স্পষ্ট: ভারত সরকারের জবাবদিহি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার। নরেন্দ্র মোদি সরকার কিন্তু শিক্ষার্থীদের এই সাহস ও উদ্দীপনার উত্তর দিয়েছে চরম কাপুরুষতা আর নির্মম নিষ্ঠুরতায়। দেশের ভবিষ্যতের কান্ডারি ভাবার বদলে সরকার তাঁদের বিবেচনা করছে ‘জাতীয় শত্রু’ হিসেবে।

২০২৬ সালের ২০ জুলাই ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এদিন দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) চড়াও হয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর। কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও নির্মম লাঠিপেটার মতো অযাচিত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা হয় বিক্ষোভ। হামলায় বহু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

এমনকি যেসব শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরছিলেন, তাঁদের পিঠ ও মাথায়ও অকাতরে পড়েছে লাঠির আঘাত। পেলেট গানের ছররায় ক্ষতবিক্ষত তরুণদের এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেশবাসীকে দেখতে হয়েছে। এটা নিশ্চিতভাবেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়।

দিল্লির রাজপথ যখন জ্বলছে, সংসদ তখন চুপ থাকতে পারে না

সেদিনের ভিডিওগুলো আমাদের স্মৃতিতে খোদাই হয়ে গেছে, নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা জাতির বিবেক। শুধু সরকার ও তাদের তাঁবেদার গণমাধ্যমগুলোই তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণজাগরণকে ঘিরে গল্প ফাঁদার চেষ্টা করছে।

এখনই আমাদের বলতে হবে: থামুন! তাঁরা আমাদেরই সন্তান, আমাদেরই ছেলে-মেয়ে।
আলোচনার বদলে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়াটাই মোদি সরকারের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কৃষক থেকে শুরু করে মানবাধিকারকর্মী—সবার ক্ষেত্রেই একই চালচিত্র দেখা গেছে। কিন্তু চলতি সপ্তাহে এই সরকার স্বৈরাচারী শাসনের যে চরম নিদর্শন দেখাল, তা অতীতে কোনো সরকার দেখায়নি।

আমাদের হবু চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, আমলা, উদ্যোক্তা আর দেশগঠনে নিবেদিতপ্রাণ এই তরুণদের কাছে সমবেদনার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার বদলে সরকার তাঁদের ওপর নামিয়ে এনেছে রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম নিপীড়ন। এটি কোনোভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়, ভুলেও যাওয়ার মতো নয়।

যেকোনো ভিন্নমতকে ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়ার পুরোনো চক্রান্ত এবারও নামানো হয়েছে শিক্ষার্থী আন্দোলনকে কলঙ্কিত করতে। আন্দোলনকারীদের প্রতি সন্দেহ তৈরি করা এবং ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়ানোর সব রকম চেষ্টা করেছে মোদি সরকার। অথচ তাদের উচিত ছিল এমন নীতিগুলোর প্রতি নজর দেওয়া, যা আজ শিক্ষার্থীদের রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে।

ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকেরা চলমান বিক্ষোভের সময় পতাকা ও প্ল্যাকার্ড বহন করছেন। যন্তর মন্তর, নয়াদিল্লি, ভারত

পাবলিক শিক্ষার অধঃপতন

প্রথম মৌলিক সমস্যাটি হলো পাবলিক শিক্ষা–সংক্রান্ত ক্ষেত্রগুলো থেকে মোদি সরকারের পিছু হটা। সরকার বাজেটে স্কুল শিক্ষার বরাদ্দ ৫০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ ৩৩ শতাংশ কমিয়েছে। এমন খামখেয়ালি ও অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে? গত ১২ বছরে মোদি সরকার প্রায় ১ লাখ সরকারি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে; অন্যদিকে চালুর সুযোগ করে দিয়েছে ৪৩ হাজার বেসরকারি স্কুল। যার একটি বড় অংশই পরিচালনা করছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো। তারাই ঘটনাচক্রে ভারতে বেসরকারি স্কুলগুলোর বৃহত্তম নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে।

উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনুদান কমিয়ে তাদের উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য করছে। সেই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

মানসম্মত ও সাশ্রয়ী পাবলিক শিক্ষা যখন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তখন পরিবারগুলোকে নিজেদের পকেট কেটে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হচ্ছে। সর্বভারতীয় মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা (নিট) কোচিংয়ের পেছনেই পরিবারগুলো যে টাকা খরচ করে, তা মোদি সরকারের শিক্ষায় মোট বিনিয়োগের সমান!

তেলাপোকাদের লড়াইয়ের পরিধি এখন অনেক বড়

চড়া খরচে বেসরকারি পড়ালেখার হাতছানি বহু মেধাবী কিন্তু মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট করছে। আরও আশঙ্কাজনক হলো, এই উচ্চ ব্যয় শিক্ষার্থীদের ওপর এক অসহনীয় মানসিক চাপ তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরাও দেখছেন যে তাঁদের সাফল্যের জন্য পরিবারের কত বড় ত্যাগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের এই তীব্র হাহাকার ও হতাশা কিন্তু শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও বেসরকারীকরণেরই সরাসরি ফলাফল।

দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) চলমান আন্দোলনে অংশ নিয়ে জাপানি মাঙ্গা সিরিজ ‘ওয়ান পিস’-এর প্রতীকসংবলিত পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন সিজেপির এক সমর্থক। যন্তর মন্তর, নয়াদিল্লি, ভারত, ২৩ জুলাই। ছবি: রয়টার্স

ভঙ্গুর পরীক্ষাব্যবস্থা ও সাফল্যের সংকট

দ্বিতীয় সমস্যাটি হলো ভারতের সরকারি পরীক্ষাব্যবস্থার কঙ্কালসার অবস্থা। সমগ্র ব্যবস্থাটিকে কেন্দ্রীকৃত, বেসরকারীকৃত এবং রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে। আগে বিভিন্ন রাজ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী স্বতন্ত্র পরীক্ষা নিত। কিন্তু সেই ঐতিহ্যবাহী প্রথা বাতিল করে ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’র (এনটিএ) অধীনে সিইউইটির মতো কেন্দ্রীকৃত পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এই এনটিএ সংস্থাটি নিজেই এখন এক চরম বিশৃঙ্খল ও কর্মী–সংকটে ভোগা প্রতিষ্ঠান, যা পরীক্ষা নেওয়ার জন্য পুরোপুরি বেসরকারি ঠিকাদারদের ওপর নির্ভরশীল। প্রশ্নকর্তা, অনুবাদক কিংবা বিশেষজ্ঞ হিসেবে এনটিএ যাঁদের যুক্ত করে, তাঁরা দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ নন; বরং রাজনৈতিক আনুগত্য থাকা মধ্যমানের ব্যক্তিত্ব।
এই ব্যবস্থার পরিণতি ভয়াবহ।

গত ১২ বছরে দেশে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৯টিই ঘটেছে ২০১৭ সালে এনটিএ গঠিত হওয়ার পর থেকে! এমনকি অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীরাও আজ অকৃতকার্য হচ্ছেন, কারণ কর্তৃপক্ষ কোনো দায়বদ্ধতা ছাড়াই পরীক্ষাব্যবস্থা থেকে স্রেফ মুনাফা লুটছে।

দম্ভের কারণেই কি ‘ককরোচদের’ বুঝছে না মোদি সরকার?
মোদি সরকার যে শুধু ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে তা-ই নয়; স্বৈরাচারী মনোভাব, আত্মমোহ এবং চরম সংবেদনশীলতাহীন আচরণকে তারা অভ্যাসে পরিণত করেছে। কিন্তু ভারতের তরুণ শিক্ষার্থীরা মোদি সরকারের এই ভণ্ডামি ধরে ফেলেছেন। আন্দোলনকারী এসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা এখন আমাদের নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

তৃতীয় সংকটটি হলো এই শিক্ষাব্যবস্থায় সফলতা অর্জনের কঠিন বাস্তব চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিতে একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে স্নাতক পাসের পর ভালো বেতনের মানসম্মত চাকরি পাওয়া এখন সোনার পাথরবাটি। গত কয়েক বছরে তরুণ স্নাতকদের বেকারত্বের হার গড়ে ৪০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। অল্প কিছু চাকরির জন্য যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, তার মুখোমুখি হতে শিক্ষার্থীরা কিন্তু মোটেও প্রস্তুত নন।
দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে অযোগ্য উপাচার্যদের নিয়োগ এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের হাত ধরে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিন্তু অযোগ্য শিক্ষকদের আনাগোনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতার মানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকদের মিছিলে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার জবাবদিহি ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এক বিক্ষোভ পালন করেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সমর্থকেরা। এ সময় তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাসের সেল ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিহারে।

কাজের ক্ষেত্রে যখন আধুনিক ও জটিল দক্ষতার প্রয়োজন বাড়ছে, তখন ভারতের উচ্চশিক্ষা আটকে আছে পুরোনো ব্যবস্থা আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পাঠ্যক্রমে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বর্তমান যুগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যুগের চাহিদা থেকে বহু দূরে। শিক্ষার্থীরা এমন এক প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন, যার জন্য তাঁদের উপযুক্ত কোনো সুযোগ-সুবিধাই দেওয়া হয়নি।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সফল হওয়া প্রায় অসম্ভব। আর কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে মোদি সরকারের জবাবদিহি এড়ানো ও শিক্ষার উন্নয়নে ইতিবাচক আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব। কোনো ধরনের জাতীয় সম্মতি বা সংসদে আলোচনা ছাড়াই তারা ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০’ পাস করিয়ে নেয়।

এনটিএকে কখনোই সংসদের আওতায় আনা হয়নি; ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গড়া এই কেন্দ্রীয় সংস্থার ওপর কোনো জবাবদিহি খাটে না। শিক্ষামন্ত্রী নিজে সংসদীয় কমিটির সুপারিশকে প্রকাশ্যে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে জবাবদিহির প্রতি চরম অবজ্ঞা দেখিয়েছেন, শুধু সেই কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা ছিলেন বলে! এত বড় ব্যর্থতার পরও পদত্যাগ করতে তাঁর অনিচ্ছা জনগণের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে।

আন্দোলনের মূল শিকড়

আজকের আন্দোলন এই আন্তসম্পর্কিত সংকটগুলোরই স্বাভাবিক পরিণতি। হতাশাপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা আর মোদি সরকারের চিরচেনা অহংকার, অহংবোধ এবং দায়বদ্ধতাহীন আচরণ তরুণদের আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সরাসরি অধীনে থাকা পুলিশ বাহিনীর এই হিংস্র আচরণ কিন্তু নজিরবিহীন নয়। ২০২০ সালে সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনী কীভাবে হামলা চালিয়েছিল, তা সবার মনে আছে। ভারতের নারী কুস্তিগীরদের ওপর যে অন্যায় অত্যাচার করা হয়েছিল, সেই স্মৃতিও মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

মোদি সরকার যে শুধু ভারতের শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে তা-ই নয়; স্বৈরাচারী মনোভাব, আত্মমোহ এবং চরম সংবেদনশীলতাহীন আচরণকে তারা অভ্যাসে পরিণত করেছে। কিন্তু ভারতের তরুণ শিক্ষার্থীরা মোদি সরকারের এই ভণ্ডামি ধরে ফেলেছেন। আন্দোলনকারী এসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা এখন আমাদের নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।

  • সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির চেয়ারপারসন।

দ্য হিন্দু থেকে অনূদিত