২০১৬ সালের ১৫ জুলাই রাত সাড়ে ৭টার দিকে (জিএমটি) তুরস্কের সেনাবাহিনীর একটি অংশ প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের নির্বাচিত সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালায়।
ট্যাংক ও যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে চালানো এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ব্যর্থ হয়ে যায়। দেশটির বড় শহরগুলোর রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে আসে। তারা সেনাবাহিনী ও পুলিশের সরকারপন্থি সদস্যদের পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর কমান্ড কাঠামোর বড় অংশের সঙ্গে মিলে বিদ্রোহীদের প্রতিহত করে।
১০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থান শুধু তুরস্কের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থান প্রচেষ্টাই ছিল না, এটি দেশটির বেসামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনীর সম্পর্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ওই ঘটনায় প্রায় ২৫০ জন নিহত এবং ২ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।
অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল উনাল আতাবায় বলেন, ১৫ জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পেছনে তিনটি বড় কারণ ছিল।
তিনি বলেন, জনগণের প্রতিরোধ, অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করা তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা, নন-কমিশন্ড কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের ভূমিকা এবং সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তুরস্কের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর দীর্ঘ প্রভাব
তুরস্কের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সামরিক হস্তক্ষেপের প্রভাব ছিল। সেনাবাহিনী ১৯৬০ ও ১৯৮০ সালে সরকার উৎখাত করে। ১৯৭১ সালে একটি সামরিক স্মারকের মাধ্যমে সরকারকে চাপের মুখে ফেলে এবং ১৯৯৭ সালে আধুনিক অভ্যুত্থান নামে পরিচিত এক প্রক্রিয়ায় আরেকটি নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।
প্রতিবারই বেসামরিক সরকার ফিরে এলেও সেনাবাহিনী তুরস্কের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে থেকে যায়। তারা নিজেদেরকে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নীতিমালার রক্ষক হিসেবে দেখত।
তবে তুরস্কের প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতারা এমন সামরিক ভূমিকা চাননি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার দুই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক ও ইসমেত ইনোনু সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী চারকোগলু বলেন, প্রজাতন্ত্রের শুরুতে সামরিক নেতৃত্ব ও বেসামরিক রাজনীতির মধ্যে স্পষ্ট বিভাজনকে একটি মৌলিক নীতি হিসেবে দেখা হতো।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী যদি রাজনীতিতে যুক্ত থাকতো, তাহলে দুর্বল ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠী এটিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারতো। সে সময়ের নেতারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে সেনাবাহিনীকে রাজনীতির বাইরে থাকতে হবে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনী নিজেদের রাষ্ট্রের রক্ষক হিসেবে দেখতে শুরু করে এবং সেই ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বারবার রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা দেখায়।
২০১৬ সালের পর সামরিক বাহিনীতে বড় পরিবর্তন
তুরস্কের বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দেশটিতে আরেকটি প্রচলিত ধরনের সামরিক অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা অনেক কম।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সেন্ট লরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তুরস্ক বিশেষজ্ঞ হাওয়ার্ড আইসেনস্ট্যাট বলেন, কখনোই একেবারে অসম্ভব বলা যায় না। তবে তুরস্কে সামরিক অভ্যুত্থানের ওপর বাজি ধরা মানে অর্থ হারানোর মতো।
২০১৬ সালের অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর সরকার সেনাবাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করে। এর আগে ২০০২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব কমানোকে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিল।
তুরস্ক সরকার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ধর্মীয় নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনের অনুসারীদের সংগঠনকে (যাকে তুর্কি সরকার ফেতুল্লাহ টেররিস্ট অর্গানাইজেশন বা ফেতো নামে অভিহিত করে) অভ্যুত্থানের পেছনে দায়ী করে।
এরপর সেনা সদস্য, বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীসহ হাজার হাজার মানুষকে বরখাস্ত করা হয় বা গ্রেফতার করা হয়। সামরিক একাডেমিগুলো বন্ধ করে ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয় এবং সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক তদারকি বাড়ানো হয়।
উনাল আতাবায় বলেন, এসব পরিবর্তনের ফলে সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের ধরন মৌলিকভাবে বদলে গেছে।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী নিজেদের ভেতরের নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করেছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সংগঠিত গোষ্ঠী আবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
গণতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক
তবে আলী চারকোগলুর মতে, শুধু সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনা দিয়েই তুরস্কের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না।
তিনি বলেন, সামরিক বাহিনীকে বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীনে আনা অবশ্যই একটি সাফল্য। কিন্তু যদি এর বিনিময়ে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তা তুরস্কের রাজনীতির জন্য অন্তত একটি দুর্ভাগ্যজনক বিষয়।
তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বৈধতা শুধু কে তা নিয়ন্ত্রণ করছে তার ওপর নির্ভর করে না; বরং জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপরও নির্ভর করে।
২০১৬ সালের উত্তরাধিকার নিয়ে চলমান বিতর্ক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করে আসছে যে বিরোধী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) নেতা ও ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামওগ্লুর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং কয়েকজন বিরোধী মেয়রের গ্রেফতার।
তবে সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তদন্তগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং অপরাধের প্রমাণের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
২০০২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে একেপি প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে জয় পেয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ২০১৬ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী জরুরি অবস্থার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, অভ্যুত্থানে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অনেক নিরপরাধ সরকারি কর্মীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সরকারের দাবি, রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা গোপন নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা এবং ভবিষ্যতে এমন হুমকি ঠেকানোর জন্য এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।
সূত্র: আল-জাজিরা
এমএসএম








