চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে ৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দু’বছর পার হলেও একটি মামলাতেও চার্জশিট দাখিল করেনি পুলিশ। এদিকে ৬টি হত্যা মামলা ঘিরে কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।৬ মামলায় আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি, শীর্ষ নেতা ও রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশের সাবেক ডিআইজি, এসপি, পুলিশ কমিশনার, সহকারী কমিশনার, ওসি, এসআইসহ শতাধিক কর্মকর্তা আসামি হয়েছেন। তবে এসব কর্মকর্তা ও নেতাদের অনেকে মামলার বাদীকে ম্যানেজ করে আদালতে এফিডেভিট করিয়ে নিয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে- ঘটনার সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা নেই।বাদীদের একাংশ আদালতে এফিডেভিটের মাধ্যমে জানিয়েছেন, বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি, এসপি, পুলিশ কমিশনার, উপ-কমিশনার, সহকারী কমিশনারদের নাম তারা মামলা দায়েরের সময় দেননি। পরে জানতে পেরে তারা বুঝতে পারেন, এসব কর্মকর্তা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। এফিডেভিটের কপি সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।নিহত কলা ব্যবসায়ী মেরাজুলের মা আম্বিয়া বেগম জানান, কয়েকজন আইনজীবী তার বাসায় এসে মামলা করতে বলেন। তিনি জানেন না মামলায় কাদের আসামি করা হয়েছে। তিনি শুনেছেন, ২১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের কাউকেই তিনি চেনেন না।শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আবদুর রহমান মামলায় ৪০ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাতনামা আসামি রেখেছেন আরও ২/৩শ জন। ব্যবসায়ী সাজ্জাদের স্ত্রী জিতু বেগম ৫৭ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাতনামা আসামি রেখেছেন ৩শ জন। কর্মচারী মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা বেগম ১৭ জনের নাম উল্লেখ করলেও অজ্ঞাতনামা বহু আসামির কথা উল্লেখ করেছেন। যুবক মাহমুদুল হক মুন্নার বাবা আবদুল মজিদ ১২৮ জনের নাম এবং অটোচালক মানিকের মা নুরজাহান বেগম ১১৯ জনের নাম উল্লেখ করেছেন।বাদীরা স্বীকার করেছেন, তারা জানেন না কাদের আসামি করা হয়েছে। তাদের অনেককে এফিডেভিট করতে বলা হয়েছে, যেখানে আসামিদের ঘটনার সময় উপস্থিত না থাকার কথা বলা হয়েছে।রংপুরের সিনিয়র আইনজীবী রইছ উদ্দিন বাদশা বলেন, মামলা দায়েরের পর ‘চিনি না, আসামি করিনি’ বলে এফিডেভিট করলে আইনগত কোনো মূল্য নেই। তবে এতে মামলা দুর্বল হয়ে যায়। তিনি বলেন, এভাবে মামলার নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। অনেক নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চার্জশিট দাখিল করলেও বিচারের সময় বাদীরা সাক্ষ্য দেবেন না, ফলে মামলা প্রমাণ করা কঠিন হবে।বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর মহানগরের সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক নাহিদ হাসান খন্দকার বলেন, নিহতদের মামলায় ৮০ শতাংশ আসামি নিরপরাধ। তিনি অভিযোগ করেন, ৬টি হত্যা মামলার আসামি কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি, অথচ তারাই গুলি করেছে, হুকুম দিয়েছে ও ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসন রক্ষায় কাজ করেছে। তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীতে এখনও ফ্যাসিস্টদের দোসর রয়েছে।রংপুর সিআইডির পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী জানান, মামলায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এক পুলিশ সদস্য আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি পেয়েছেন তারা।সুমিত চৌধুরী আরও বলেন, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের অনুমতি এখনও পাওয়া যায়নি। আশা করছি দ্রুত পাবো। অনুমোদন পেলে আগামী এক মাসের মধ্যে চার্জশিট দাখিল সম্ভব হবে বলে জানান তিনি। বাদীদের এফিডেভিটের বিষয়ে তিনি বলেন, এসবের আইনগত কোনো মূল্য নেই।
রাজনীতি
জুলাইয়ে রংপুরে ৬ হত্যাকাণ্ড: চার্জশিট নেই দুই বছরেও

শেয়ার করুন







