জুন মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব ভায়োলেন্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক গ্রেফতার, অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার এবং সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সূচকে উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) মে–জুন ২০২৬ সময়কালের মানবাধিকার পরিস্থিতির মনিটরিং প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে এমএসএফ জানিয়েছে, জুন মাসে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি হয়েছে এবং পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সংগঠনটির মতে, এ চিত্র দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।

এমএসএফের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মে মাসের তুলনায় জুন মাসে সহিংসতা অব্যাহতভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়ে গেছে; নিহতের সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও আহতের সংখ্যা ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। মে মাসে মব ভায়োলেন্সে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩২, যা জুনে বেড়ে ৩৩ হয়েছে। অন্যদিকে মে মাসে এ ধরণের অপরাধে আহত হয়েছেন ৭১ জন, জুনে তা বেড়ে ১২৬ হয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, জুনে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা ৫৭ শতাংশ বৃদ্ধি এবং নিহতের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে ক্রমশ সহিংস ও অনিরাপদ করে তুলছে। জুনে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৩০৩ ও নিহত হয়েছেন ৭ জন। মে মাসে যা ছিল যথাক্রমে ১৯৩ ‍ও ৩ জন।

বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ২০২৪ সালের সরকার পতন-পরবর্তী মামলাসমূহে গ্রেফতার সংখ্যা মে মাসের তুলনায় জুনে ৭ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৪ এর সরকার পতন-পরবর্তী মামলায় মে মাসে গ্রেপ্তার হয়েছে ৬৫ জন, যা জুনে বেড়ে ৪৭৩ হয়েছে।  সংগঠনটি বলছে, এ ধরণের মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা দমনমূলক ব্যবস্থার সম্ভাবনার সংকেত দেয় এবং বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এমএসএফ জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষ, হেফাজতে মৃত্যু এবং কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধিও মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিকে আরও স্পষ্ট করে। জুন মাসে প্রথমবারের মতো হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা এবং কারাগারে মৃত্যুর বৃদ্ধি (৭ থেকে ৯) উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

অজ্ঞাতপরিচয় ও পরিচয় শনাক্ত মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা জুন মাসে মে মাসের তুলনায় ২২ শতাংশ বেড়েছে। মে মাসে যেখানে ৫৩টি মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল, জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫টিতে।

এমএসএফ জানায়, উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে ৩১ থেকে ৪০ বছর বয়সী ব্যক্তির সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি— মোট ২৭ জন। এদের মধ্যে ২১ জন পুরুষ। এছাড়া মোট উদ্ধার হওয়া ৬৫টি মরদেহের মধ্যে ৫২ জনই পুরুষ এবং ১২ জন নারী, যা নারী মরদেহের তুলনায় পুরুষের সংখ্যা চার গুণেরও বেশি।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ ও ২৬ জুন রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সুমনের মরদেহ উদ্ধারের পর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা-কর্মীর ফেসবুক পেজ ও আইডি থেকে দাবি করা হয়, তুরাগ থানা এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে হামলার পর সাত নেতা-কর্মী নিখোঁজ হন এবং তাদের মধ্যে তিন থেকে চারজনের মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পুলিশ এসব দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এমএসএফ জানায়, সীমান্ত পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে নিহতের সংখ্যা কমলেও পুশ-ইনের চেষ্টা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পয়েছে। জুন মানে ভারতীয় সীমান্ত থেকে  ৪২৩ জন কে পুশ-ইন করার চেষ্টা করা হয়েছে। যা আগের মাসে ছিল শূণ্য।

এছাড়া জুন মাসে মাজারে হামলার ঘটনায় চাদপুরে ১০ জন আহত,আেইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ১ জনের মৃত্যু ও ১৯জন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এমএসএফ মনে করে, এই পরিস্থিতি উত্তরণে আইনের শাসন জোরদার, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় কার্যকর নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

এসএফ/এমএএইচ/