গত জুন মাসে দেশে ৫৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৩ জন নিহত এবং ১ হাজার ৩২৩ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১৩২ জন। মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৩৩ শতাংশ, নিহতের ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং আহতের ৯ দশমিক ৯৭ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

আজ মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম বিভাগে। সেখানে ১২৮টি দুর্ঘটনায় ১২৬ জন নিহত এবং ৩৭৩ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। এ বিভাগে ২৫টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৫ জন।

জুন মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় জড়িত ৭৯৫টি যানবাহনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ২৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান ও লরি, ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বাস, ১৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা, ট্রাক্টর ও লেগুনা এবং ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ কার, জিপ ও মাইক্রোবাস।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক ২৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষে, ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ গাড়িচাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনায়, ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বিভিন্ন কারণে, শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ ওড়না চাকায় পেঁচিয়ে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ ট্রেন ও যানবাহনের সংঘর্ষে ঘটেছে।

সড়কের ধরন অনুযায়ী বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট দুর্ঘটনার ৪৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ফিডার সড়কে ঘটেছে। এ ছাড়া মোট দুর্ঘটনার ৪ দশমিক ১৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরে, শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরে এবং ১ দশমিক ১২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনার উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবাধ চলাচল, রোড সাইন, রোড মার্কিং ও সড়কবাতির অভাব, মহাসড়কে মিডিয়ান না থাকা এবং গাছপালার কারণে অন্ধ বাঁকের সৃষ্টি, সড়ক ও যানবাহনের ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য, উল্টো পথে যান চলাচল, চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া ও বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো, বৃষ্টিতে সড়কে গর্ত সৃষ্টি ও ভাঙাচোরা সড়ক এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে নিম্নআয়ের মানুষের বাস ও ট্রাকের ছাদে কিংবা পণ্যবোঝাই ট্রাকে যাতায়াতকে দায়ী করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে ১১ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে। এতে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু, চালকদের আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে ফুটপাত ও সার্ভিস লেন নির্মাণ, কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মহাসড়কে পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, রোড সাইন ও রোড মার্কিং স্থাপন, মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, ফিটনেস প্রদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ গণপরিবহন উচ্ছেদ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং পরিবহন খাতে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে প্রতিবছর হাজারো মানুষের প্রাণহানি বন্ধে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআরটিএকে আমলানির্ভর না রেখে দেশি-বিদেশি পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও সড়ক নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ই-প্রসিকিউশন চালু এবং যাত্রীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।