বর্ষাকালের অনিয়ন্ত্রিত বৃষ্টিপাত এবং যত্রতত্র জলাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিস মশার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাবে মে মাসে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা ছিল ৭১৪ জন। জুনে এ রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯০৭ জনে। অর্থাৎ শুধু এক মাসেই চারগুণ রোগী বেড়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে মৃত্যুও। সরকারি হিসাবে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে এবং মে মাসে একজন ডেঙ্গু রোগী মারা গেছে। অন্যদিকে শুধু জুনেই মারা গেছে ১৩ জন।

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় কারও মৃত্যু হয়নি। তবে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪৭ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪১৪ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৯ জন।

এদিকে জুলাইয়ে বৃষ্টি ও তাপপ্রবাহ উভয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ভারি বৃষ্টির কারণে উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, অতিবৃষ্টি এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে মশার বংশবিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে। তারা বলছেন, এখনই পদক্ষেপ না নিলে জুলাই-আগস্টে ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে ডেঙ্গু। আর জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা জোরদার করতে না পারলে মৃত্যু আরও বাড়তে পারে।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) এন্টোমোলোজি (কীটতত্ত্ব) বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. গোলাম ছারোয়ার যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা মূলত এডিস মশার ঘনত্বের ওপর নির্ভরশীল। আর এডিসের বিস্তার নিয়ন্ত্রিত হয় বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতার মতো পরিবেশগত উপাদান দ্বারা। বর্ষা মৌসুমে এসব অনুকূল থাকায় এডিসের প্রজনন ও জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয়, ফলে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ে। তিনি বলেন, প্রতিবছর অন্তত তিনবার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এডিস মশার ঘনত্ব জরিপ করা প্রয়োজন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড প্রয়োগ, ব্যবহৃত কীটনাশকের গুণগত মান নিশ্চিত এবং মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশক যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়; এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই কিউলেক্স ও এডিস মশাকে একসঙ্গে বিবেচনা না করে এডিস দমনে পৃথক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।

চোখ রাঙাচ্ছে ডেন-৩ : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে ডেঙ্গু ভাইরাস প্রধানত চার ধরনের হয়ে থাকে। দেশে ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডেন-৩ এর প্রাধান্য ছিল। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে প্রধান সেরোটাইপ ছিল ডেন-২। তবে এ বছর মে-জুনে পরীক্ষা করা নমুনায় ডেন-৩ আবার প্রধান সেরোটাইপ হিসাবে পাওয়া যাচ্ছে।

আইইডিসিআর-এর মেডিকেল অফিসার ডা. মো. আব্দুল্লাহ উমর নাসিফ যুগান্তরকে বলেন, মে থেকে জুনে ল্যাবে ৭১টি নমুনার সেরোটাইপ বিশ্লেষণ করে ডেন-৩ সেরোটাইপ বেশি পাওয়া গেছে। সেরোটাইপের এ পরিবর্তন উদ্বেগের বিষয়, কারণ আগে ডেন-২-এ আক্রান্তরা পরে ডেন-৩-এ সংক্রমিত হলে মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণলায় কী করছে : ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেলে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুই মাস ধরে সরকার জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘লার্ভা ধ্বংস করার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল ট্যাবলেট ৭ দিনের মধ্যে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছোট ছোট স্থানে জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা বা টায়ারে এই ট্যাবলেট ব্যবহারে লার্ভা দ্রুত ধ্বংস হবে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্লাজমা লিকেজের কারণে অনেক সময় রোগী মারা যায়। এজন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সমন্বয়ে একটি ‘ডেইলি ট্রিটমেন্ট প্রটোকল’ তৈরি করে তা সব চিকিৎসকের মোবাইলে ও ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনো ডেঙ্গু রোগীর জ্বর ভালো হয়ে গেলেও পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না।’