আমার এক বন্ধুস্থানীয় কবি ইদানীং কিছুতেই লেখাজোখায় মনোযোগ আনতে পারছেন না। আমি তার অমনোযোগিতার কারণ জিজ্ঞেস করতেই ঝটপট উত্তর, ‘আরে বোঝেন না! দেখছেন না চারদিকে ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে কেমন উন্মাদনা।’

‘তাতে আপনার কী? সেদিন তো আজিজ মার্কেটে বসে বললেন, আপনি খেলাধুলা বোঝেন না। আপনার মতো এত সচেতন মানুষ ফুটবল খেলা বোঝেন না, জেনে উপস্থিত সবাই আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করল।’ বন্ধুটি আমার কথা শুনে মাথাটি হালকা ঝাঁকালেন।

আমার এ কবি বন্ধু তার ফেসবুক আইডি থেকে অবশ্য ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো পোস্ট দেননি এখন পর্যন্ত। এতেই বিশ্বাস হয়, তিনি আসলেই ফুটবল খেলার আগে-পিছে নাই। অথচ এ বন্ধুটি অন্যের হেন কোনো ফেসবুক পোস্ট নাই, যেখানে তার কমেন্টস থাকে না। ফেসবুকে তার এই সরব-সরস উপস্থিতি নিয়ে বন্ধু তালুকদার আমাকে কম কথা শোনাননি! আমাকে তিন দিন অভিযোগ করেছেন তার ফেসবুক কমেন্টসসংক্রান্ত বিষয়ে। বলেছেন, ‘হাসনাত বলো তো, তার কী কোনো কাজ নেই! সবার পোস্টে কমেন্টস করে বেড়ায়!’

এ বিষয়ে আমি তালুকদারের মতো গুরুস্থানীয় ব্যক্তির প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিতে পারিনি। কবি বন্ধুকে বললাম, ‘ফেসবুকে সবার পোস্ট এখন ফুটবলসংক্রান্ত। সেখানেও আপনাকে সংক্রমিত হতে দেখছি না। আপাতত আপনার সময়ও বেঁচে যাচ্ছে ঢের।’

কবির তড়িৎ জবাব, ‘কীসের সময় বাঁচা! আপনি এসবের কিছুই বুঝবেন না।’

বললাম, ‘না বোঝার কী আছে? আগে দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা থাকতেন কমেন্টসগিরিতে। অন্যের ফেসবুকের কমেন্টস বক্সে না থেকে যদি আপনি খেলার মাঠে কমেন্টারি করতেন, তাও নাম যশ আসতো। ফেসবুকে কমেন্টস করে কেউ সেলিব্রিটি হয়েছে, এমন নজির আছে নাকি? সময়টা তো লেখালেখি করে কাজে লাগাতে পারেন।’

কবি আমার কথায় রেগে গিয়ে বললেন, ‘আমি আছি ঝামেলায়, অথচ আপনি খোঁচাচ্ছেন।’

‘আরে! ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে আপনার ঝামেলা কোথায়? আর এর সঙ্গে আপনার লেখালেখি না হওয়ারও তো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।’

এবার কবি বললেন, ‘আরে, বড় ছেলের স্কুলের ম্যাডাম সাপোর্ট করেন আর্জেন্টিনা। এজন্য ছেলে স্কুলে যেতে চায় না। আমি চলে আসার পর ছেলেও স্কুল থেকে চলে আসে। তাই ওর ছুটি হওয়া পর্যন্ত স্কুলেই থাকতে হয় আমাকে।’

‘স্কুলের ম্যাডাম আর্জেন্টিনা সাপোর্ট করলে ছেলের সমস্যা কী? ছেলে তো আর কোনো দল সাপোর্ট করে না।’

‘কীসের সাপোর্ট করে না। সে করে ব্রাজিল। ঘোর ব্রাজিল।’

‘কীভাবে?’

‘আমিও বুঝে উঠতে পারছি না। আমার বাসায় টিভি নেই, কিছু নেই। অথচ ওদের ফুটবল দল সাপোর্ট করা আসে কোত্থেকে?’

‘তার মায়ের কাছ থেকে মনে হয় দল সাপোর্ট করা শিখছে।’

‘না, না, না-আপনার ভাবীও খেলা দেখে না। বললাম না টিভি নেই।’

‘তাইলে ওর বন্ধুদের কাছ থেকে শিখেছে।’

কবি এ যাত্রায় হেসে বললেন, ‘আরে বড় ছেলেটা তো পড়ে শুধু ক্লাস ফোরে। এ বয়সে বন্ধু দ্বারা প্রভাবিত হবে নাকি? আরে প্রভাবিত হতে চাইলে হয়, ম্যাডামের পছন্দের ওপর।’

কবিকে বললাম, ‘এই আলফা-বিটা জেনারেশনের কাছে ক্লাস ফোর পর্যন্ত যথেষ্ট। আর টিভির কথা বললেন না, ইউটিউবে ঢুকে ওরা কত রাজ্য ঘোরাফেরা করে তার হিসেব আছে।’

‘তা করুক রে ভাই। কিন্তু ছোট ছেলে এমন খেলা পাগলা হওয়ার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।’ কবির আক্ষেপ।

‘কেন, ছোটটাও সাপোর্ট করে নাকি?’

‘আর বলবেন না। সেদিন ঝালমুড়িওয়ালাকে ডাক দিলাম। লোকটি কাছে এসে মুড়ি মাখিয়ে হাতে তুলে দিচ্ছে, অথচ ছেলেদের কেউ ঠোংগা হাতে নেবে না। ব্যাপার কী! বললাম, নিচ্ছ না কেন? ওদের দুজনের মুখে কোনো রা নেই। যখন ধমক দিতে উদ্যত হলাম, তখনই তারা বিড়বিড় করে জবাব দিল, ঝালমুড়িওয়ালার গায়ে আর্জেন্টিনা। তাইলে কন, কেমনডা লাগে অমন ছেলেপেলেদের ওপর। মুড়িওয়ালাও বক্র হাসি দিয়ে কইলেন, নিলে ন্যান, না নিলি মুড়ির দাম বুইজ্জা দ্যান।’

হাসতে হাসতে কবিকে বললাম, ‘হ, আপনি খেলা বোঝেন না বলে সেদিন সবার হাসির খোরাক হলেন। আর এদিকে আপনার ছেলেরা পাঁড় সমর্থক হয়ে আপনাকে ঝামেলায় ফেলে দিচ্ছে। টেনশন নিয়েন না। শনিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।’

আমার মুখে ‘শনিবার’ শুনেই উচ্চারণ করলেন, ‘রাখেন তো। ভাদ্র মাসকে লালটুপি পরানো হবে।’ বলেই কবি হাঁটা দিলেন। আমি তাৎক্ষণিক বুঝে উঠি নাই। পরে মনে পড়ে গেল-ওহ, এই কাহিনি! ভার্দে-কে ‘ভাদ্র’ আর কেপকে ‘টুপি’। তাকে টেক্সট পাঠালাম-আরে কবি, ল্যাঞ্জা ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট টু হাইড।