কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। প্রধান ফটক, মুক্ত মঞ্চ, জাদুঘর চত্বর ও বাগানজুড়ে পানি জমে থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন দর্শনার্থীরা। প্রতিবছর একই পরিস্থিতি হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রপ্রেমীরা।
পদ্মার তীর থেকে প্রায় ৮০০ মিটার পশ্চিমে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি। এখানেই বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন অসংখ্য গান, কবিতা, নাটক আর ছোটোগল্প।
যে গীতাঞ্জলি রচনার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন সেই গীতাঞ্জলি’র অধিকাংশ রচনাবলি এখানে বসে লেখা। এক কথায় বাংলা সাহিত্যের অনেক অমর সৃষ্টির জন্ম এই কুঠিবাড়িতে।
প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো রবীন্দ্র ভক্ত ছুটে আসেন কবির স্মৃতি বিজড়িত এই রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি দেখতে। কিন্তু কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টিতে সেই ঐতিহ্যের তীর্থভূমির চিত্রই যেন পাল্টে গেছে। কুঠিবাড়ির প্রধান প্রবেশপথ, মুক্ত মঞ্চ, ম্যুরালের সামনে, জাদুঘরের আঙিনা, এমনকি ফুল ও ফলের বাগান- সবখানেই এখন থৈথৈ পানি। কুঠিবাড়ি জুড়ে জলমগ্নতার এই চিত্র শুধু এবছরই নয় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমি এলে এমন চিত্র চোখে পড়ে।
আরও পড়ুন
সংস্কারে প্রাণ ফিরেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছারি বাড়ির
এতে ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা। এখানে ঘুরতে এসে পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। দ্রুত পানি অপসারণ করে নির্মল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ফুঁটিয়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।
কর্তৃপক্ষ বলছেন, কুঠিবাড়ির সড়ক ঘেঁষে পানি বেরুনের সরু নালা ছিল। দখল - দূষণে সেটি মরে গেছে। আবার ভারী বৃষ্টির কারণে কুঠিবাড়ির পিছনের বিলটিও পানিতে টুইটম্বর। ফলে পানি অপসারণের পরিবর্তে বিলের পানি কুঠিবাড়িতে ঢুকে পড়ছে। এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন দর্শনার্থী ও কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কুঠিবাড়ির মূল ফটকের সামনে জলাবদ্ধতা। মুক্ত মঞ্চের সামনে জমে আছে পানি। সেখানে বসে আবৃত্তি বা আড্ডার সুযোগ নেই। ম্যুরালের পাদদেশেও পানি। জাদুঘর আঙিনায় পানি জমে আছে। ফুল ও ফলের বাগানের গাছগুলো পানিতে নুয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও গাছ উপড়ে পড়ার উপক্রম। দর্শনার্থীরা শুধু পাকা ওয়াকিং পথ ধরে চলাচল করছেন। মন খুলে কুঠিবাড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছেন না।
রাজবাড়ীর পাংশা থেকে আসা দর্শনার্থী হাবিব খান বলেন, ‘কবির বাড়ি দেখার স্বপ্ন অনেক দিনের। এত দূর থেকে এসে দেখি পুরো এলাকা পানিতে ডুবে আছে। ছবি তোলার মতো একটা শুকনো জায়গাও নেই। খুব খারাপ লাগছে।’
রাজশাহী থেকে শিক্ষা সফরে আসা নাহিদ খান বলেন, ‘আমরা ৪০ জন শিক্ষার্থী এসেছি। ভেবেছিলাম মুক্ত মঞ্চে বসে কবিতা আবৃত্তি করব। আমবাগানে ছবি তুলব। কিন্তু সেখানেও পানি কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।’
রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি জুড়ে থৈথৈ পানি- ছবি: জাগো নিউজ
কুষ্টিয়া শহর থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে বেড়াতে এসেছেন বেসরকারি চাকুরিজীবী ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি বলেন, ‘কুঠিবাড়ি জুড়েই জলমগ্ন, অতিথি নিয়ে এসেছি। এই অবস্থা দেখে তারা বিব্রত। বিশ্ব ঐতিহ্যের এই জায়গার এমন দশা মেনে নেওয়া যায় না। এখানে পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকা উচিত।’
দর্শনার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, এটা শুধু কুঠিবাড়ি না, এটা আমাদের জাতীয় সম্পদ। প্রতি বছর বৃষ্টিতে একই অবস্থা হয়। স্থায়ী সমাধান কবে হবে?
টাঙ্গাইল থেকে আসা এটিএম ফরিদুজ্জামান বলেন, ‘কবি এই প্রকৃতি দেখেই লিখেছেন আর আজ প্রকৃতির পানিতেই কবির স্মৃতি নষ্ট হচ্ছে। এটা দুঃখজনক।’
শুধু দর্শনার্থীই নয়, দুর্ভোগে পড়েছেন কুঠিবাড়ির কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। জাদুঘরের ভেতরে ও বাইরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। উপড়ে পড়ছে গাছ। বাগানের ফুল ও ফলের গাছগুলো মরার উপক্রম বলে জানিয়েছেন কুঠিবাড়ির কর্মচারী সাকিব হোসেন। তার ভাষ্য, কুঠিবাড়ি পূর্বদিকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে পদ্মা নদী। আগে সড়কের ধারের সরু নালা দিয়ে পানি চলে যেত নদীতে। কিন্তু দখল দূষণে নালা মরে যাওয়ায় কুঠিবাড়ি জুড়ে এমন দুর্দশা।
জলাবদ্ধতায় কারণে দর্শনার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন শিলাইদহ রবীন্দ্র কুঠিবাড়ির কাস্টোডিয়ান আল আমীন। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। কুঠিবাড়ির পানি পূর্বের বিলে চলে যেত। কিন্তু এবার ভারী বৃষ্টির কারণে বিলের পানি চলে আসছে কুঠিবাড়িতে।
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী, কুঠিবাড়িতে উৎসবের আমেজ
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। পানি নিষ্কাশনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। না হলে কুঠিবাড়ির অবকাঠামো এবং মূল্যবান প্রত্নসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার বলেন, ‘দ্রুতই সরেজমিন পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’
আল-মামুন সাগর/এসজেডএইচ/এএসএম








