টানা ভারি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যা ও পাহাড়ধসে কক্সবাজারে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলমান দুর্যোগে জেলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ জনে। নিহতদের মধ্যে ১৭ জনই রোহিঙ্গা।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজার সদরে পাহাড়ধসে এক গৃহবধূ এবং পেকুয়ায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী এক শিশু।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম জানান, শনিবার রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বলিরপাড়া এলাকায় বন্যার পানিতে ডুবে ১৯ মাস বয়সী মুশফিকুর রহিমের মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার সৌদি প্রবাসী নাছির উদ্দীনের ছেলে।

স্থানীয়রা জানান, শিশুটির ঘরে হাঁটুসমান এবং উঠানে কোমরসমান পানি জমে ছিল। এ সময় শিশুটিকে ঘরে রেখে বাইরে কাজ করছিলেন তার মা। এক পর্যায়ে সবার অগোচরে শিশুটি পানিতে পড়ে স্রোতে ভেসে যায়। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা অনেক খোঁজাখুঁজির পর ঘর থেকে প্রায় দেড়শ ফুট দূরে ভাসমান অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে, শনিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউপির পূর্ব কলাতলীর ঝরঝরিপাড়ায় পাহাড়ধসে রোজিনা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ নিহত হন। তিনি ওই এলাকার আব্দুল মজিদের স্ত্রী।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসাইন জানান, রাতের খাবারের প্রস্তুতির জন্য পাহাড়ঘেঁষা রান্নাঘরে অবস্থান করছিলেন রোজিনা বেগম। এসময় হঠাৎ পাহাড়ধসে পড়লে ঘরসহ তিনি মাটিচাপা পড়েন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ঘণ্টা দুয়েক পর তাকে উদ্ধার করলেও বাঁচানো যায়নি। এসময় স্বামী আব্দুল মজিদ সন্তানসহ দোকানে ছিলেন বলে জানা গেছে।

আব্দুল মজিদ বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকায় তিনি স্ত্রীকে বারবার রান্নাঘরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু রাতের খাবার প্রস্তুত করতে গিয়ে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।

কক্সবাজার সদরের ইউএনও তাহমিনা আক্তার বলেন, টানা বৃষ্টিতে জেলার ক্ষতবিক্ষত পাহাড়গুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিয়মিত মাইকিং করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বলা হলেও অনেকেই আবার পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে ফিরে আসছেন। টানা বর্ষণের সময় পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা দরকার। ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ। মাইকিংসহ ফোর্সও করা হলেও বাড়ি ছেড়ে না যাওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটছেই। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের ঢাল ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করা উচিত নয়।

ইউএনও আরও বলেন, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) বিকেলে কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের দরিয়ানগর বড়ছড়া হাজীঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে লিমা আক্তার (২৫) মারা যান। এসময় তার স্বামী জসিম উদ্দিনও আহত হন। বৃষ্টির মাঝে মেরিন ড্রাইভের হিমছড়ি এলাকায়ও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কিছুক্ষণ যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। বৃষ্টি দুর্যোগকালীন সময়ে সবাইকে নিরাপদে থাকার আহ্বান জানান ইউএনও।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরও কয়েকদিন মাঝারি থেকে ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি থাকায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোয় সতর্কতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, জেলার দুর্গত উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কাজ করছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সবসময় প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে। সবাইকে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার আহ্বান জানান ডিসি। সপ্তাহজুড়ে কক্সবাজার জেলায় পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে ২৮ জন নিহত হয়েছেন। এদের মাঝে রোহিঙ্গা রয়েছেন ১৭জন।

সায়ীদ আলমগীর/কেএইচকে