নেতাজি ভবন মেট্রো থেকে যতীন দাস পার্ক স্টেশনে নেমে গেলাম। প্ল্যাটফর্ম থেকে বের হয়ে হাজরা মোড়ে দাঁড়ালাম। চারমুখী ব্যস্ত সড়কে তখন যানবাহনের অবিরাম ছুটে চলা। হাজরা মোড়ের চির চেনা কোলাহল পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে আলিপুরের দিকে হাঁটছি। মাঝপথে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি নামল। বৃষ্টিতে ধুলোমাখা শহর ধুয়ে গেল বটে কিন্তু ভ্যাপসা গরম কমল না। উল্টো বাতাসে জলীয় বাষ্প মিশে পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আবার হাঁটা শুরু করলাম। সামনে ছোট্ট এক সেতু। সেটি পেরোতেই চোখে পড়ল লাল ইটের উঁচু দেওয়াল। তখনো নিশ্চিত নই গন্তব্যে পৌঁছেছি কি না। কিন্তু স্থাপনাটি দেখে মনে হলো, এই দেওয়াল হয়তো শত শত বন্দির দীর্ঘশ্বাস আর কান্নার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক কদম এগোতেই সামনে ভেসে উঠল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল মিউজিয়ামের প্রবেশদ্বার।
বৃষ্টিতে ধোয়া লাল ইটের দেওয়ালে তখন সূর্যের আলো পড়েছে। চকচক করছে পুরো স্থাপনাটি। একসময় এটি ছিল ব্রিটিশদের কুখ্যাত কারাগার। আজ সেটিই স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি বহনকারী এক জাদুঘর। দীর্ঘ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই কারাগার উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। ব্রিটিশ শাসনামলে অসংখ্য স্বাধীনতাকামী নেতা, বিপ্লবী ও রাজনৈতিক বন্দি এখানে আটক ছিলেন। অরবিন্দ ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহেরু, দীনেশ গুপ্ত এবং ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের মতো ব্যক্তিত্বের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই কারাগারের সঙ্গে।
২০১৯ সালে কারাগারটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এটিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত জাদুঘরে রূপান্তর করে। বর্তমানে এটি ‘ইন্ডিপেনডেন্স মিউজিয়াম’ নামে পরিচিত। লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই যেন কলকাতা শহরটা বাইরে রয়ে গেল। চারদিকে এক ধরনের নিস্তব্ধতা। অথচ সেই নীরবতার ভেতরেও যেন শোনা যায় শেকলের শব্দ, বন্দিদের পদচারণা আর স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর তরুণদের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১০
৩০ রুপিতে টিকিট সংগ্রহ করেছি। এরপর হাতে নিলাম আগের রাতে স্ক্রিনশট নেওয়া মিউজিয়ামের মানচিত্র। প্রায় ১৫ একরজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল কমপ্লেক্স ঘুরে দেখতে গেলে মানচিত্রের সাহায্য নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। প্রথমেই চোখে পড়ল সেন্ট্রাল ওয়াচ টাওয়ার। একসময় এখান থেকেই পুরো কারাগারের ওপর নজর রাখা হতো। চারপাশে বৃত্তাকারে সাজানো সেলগুলো দেখে জেরেমি বেন্থামের ‘প্যানঅপটিকন’ নকশার কথা মনে পড়ছে।

মানচিত্র অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম ফাঁসির মঞ্চের দিকে। এখানে হাফ ডজনের বেশি কনডেম সেল আছে। প্রথম সেলটাতেই ক্ষুদিরাম বসুর একটা ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। যদিও ফাঁসি কিংবা জেলে বন্দি রাখতে কখনোই তাকে আলিপুরে আনা হয়নি। তার জেলজীবন ও ফাঁসি কার্যকর হয়েছে মুজাফফরপুর কারাগারে। তবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী হওয়ায় তাঁর মূর্তি এখানে রাখা হয়েছে।
কনডেম সেলগুলোর বাইরে ইংরেজ পুলিশের প্রতিকৃতি বানানো হয়েছে। হাতে চাবুক নিয়ে রাজবন্দিদের ওপর নির্যাতন করছেন তিনি। তার পাশেই বিশাল একটি ফাঁসির দড়ির ভাস্কর্য স্থান পেয়েছে। কনডেম সেলের সঙ্গেই গড়ে তোলা হয়েছিল পোস্টমর্টেম অর্থাৎ লাশকাটা ঘর। বন্দিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এখানেই কাটাছেঁড়া চলত। এরপর সেগুলো গোপনে সরিয়ে ফেলতো তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। এভাবেই নিঃশব্দে শেষ হয়ে যেত একেকটি জীবনের গল্প।
পোস্টমর্টেম ঘর পেরোতেই কাঠের মঞ্চের ওপর সাজানো জোড়া ফাঁসির মঞ্চ। নির্জন নিস্তব্ধ সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে গা শিউরে উঠল। মিউজিয়ামের সাউন্ড বক্স থেকে ভেসে আসছে ‘কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা’ গানটি। কাঠের মঞ্চ আর মোটা দড়ির দিকে তাকিয়ে ভাবছি, স্বাধীনতা শব্দটির পেছনে কত অজানা কান্না লুকিয়ে আছে। দেশের জন্য ফাঁসির এই দড়িতে ঝুলেছেন কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত, গোপীমোহন, প্রমোদ রঞ্জন চৌধুরী, অনন্ত হরি মিত্র, দীনেশ গুপ্ত ও দীনেশ মজুমদারের মতো মহান বিপ্লবীরা।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৯
ব্রিটিশ জমানায় আলিপুর জেলের কুঠুরিতে দীর্ঘ নয় মাস কাটাতে হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বসুকে। তাঁর স্মরণে সেখানে তৈরি হয়েছে ‘নেতাজি ভবন’। সুযোগ এলেই ভবনের দোতলা থেকে ভাষণ দিতেন এ মহান নেতা। এই জেলের আট নম্বর সেলে ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। আবার ১৯৩২ সালে বন্দিদশা কাটান দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ওই ভবনের একতলার চার নম্বর সেল বহু বছর ঠিকানা ছিল বিধানচন্দ্র রায়ের। পরবর্তীকালে ওই সেলগুলোর সামনে মূর্তি বসেছে সুভাষচন্দ্র-চিত্তরঞ্জন-বিধান রায়ের। রয়েছে তাঁদের নামের ফলকও।

নেতাজি ভবনের অদূরেই বন্দি ছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু। ১৯৩৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত জেলের কুঠুরিতেই বন্দিদশা অতিবাহিত করতে হয়েছিল তাঁকে। পরে বাড়িটির নামকরণ করা হয় নেহেরুর নামেই। এসময় সুযোগ পেলেই বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন তার মেয়ে ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। গাছতলায় বসে বাবা-মেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন একাধিকবার।
এর পাশেই ছিল জেল হাসপাতাল। ভবনটি এখন রূপ নিয়েছে আধুনিক প্রদর্শনী গ্যালারিতে।এখানে রয়েছে দুর্লভ আলোকচিত্র, বিপ্লবীদের হাতে লেখা চিঠি, সংবাদপত্রের কাটিং, অস্ত্র, নথিপত্র, মানচিত্র এবং ইন্টারঅ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনী। জেল হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সাধারণ বন্দিশালায় ঢুকেছি। এখানে অনন্য সব চিত্র। শিল্পের ছোঁয়ায় ব্রিটিশদের অমানবিক অত্যাচারের চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে; তেমনি বন্দিদের কাটানো মুহূর্ত দেখানো হয়েছে। সেলের বারান্দায় বন্দিদের চুল গোফ কাটছেন নরসুন্দর। এর ঠিক পাশেই লাল পোশাকধারী ইংরেজ পুলিশ বন্দিদের পিঠে চাবুক মারছে।
বন্দিশালার মুখেই ধোপার কাজ করছে একদল। স্যাঁতস্যাঁতে মেঝের ওপর অসংখ্য বিছানা। বন্দিদের আদলে ভাস্কর্য বানানো হয়েছে। পুরোনো বন্দিরা নতুনদের কাছ থেকে শরীর মালিশ করে নিচ্ছেন। আর প্রতিটি বেড অতিক্রম করতেই নানা আলাপ শোনা যাচ্ছে। এই সেলের শেষপ্রান্তে লাকড়ির চুলায় জ্বাল হচ্ছে। হয়তো এভাবেই বন্দিশালা প্রাণবন্ত থাকতো।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৮
জেলের মাঝ বরাবর একটা ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল। এটা এখন আন্দামান জেলের আদলে রূপ পেয়েছে। যেখানে কয়েদিদের জীবনচর্চা দেখানো হয়েছে। আন্দামানে কতটা নির্মমতার সঙ্গে দিন কাটাতে হয়ে বন্দীদের, সেটি বেশ ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। এর ঠিক সামনে খোলা চত্বরে কয়েকটা বোমার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই মূলত আলিপুর বোমা মামলা এবং বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

১৯০৮ সালে মুজাফ্ফরপুরে ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপের ঘটনার পর পুলিশ কলকাতার মুরারিপুকুরের একটি গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বোমা তৈরির কারখানা, বিস্ফোরক ও অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করে। এ ঘটনাকেই কেন্দ্র করে শুরু হয় বিখ্যাত আলিপুর বোমা মামলা। সেই ঘটনাকে স্মরণ করাতেই এ শিল্পকর্ম স্থাপন করেছে হেরিটেজ কর্তৃপক্ষ।
সেন্ট্রাল জেলের এক কোণে পুরোনো শেড দেখা যাচ্ছে। প্রথমে মনে হলো হয়তো কারাগারের কোনো পুরোনো স্থাপনা। কাছে গিয়ে দেখা গেল, সেখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে চরকা, তাঁত আর স্বদেশি শিল্পের নানা নিদর্শন। লোহার গরাদ আর কারাকক্ষের ভেতরে হঠাৎ এই দৃশ্য কিছুটা বিস্মিত করলো আমাকে।
কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুধু বোমা আর বিপ্লবের গল্প নয়। এটি ছিল অর্থনৈতিক মুক্তিরও সংগ্রাম। বিদেশি কাপড় বর্জন করে দেশীয় তাঁতে বোনা কাপড় ব্যবহারের আহ্বান ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। চরকার চাকা তাই এখানে কেবল একটি যন্ত্র নয়, আত্মনির্ভরতার প্রতীক। আর তাঁত যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার লড়াই কখনো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে হয়নি; হয়েছে গ্রামের তাঁতঘরেও।
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৭
একদিকে কারাগারের সেল, অন্যদিকে চরকা আর তাঁত। দুটি দৃশ্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন একই গল্পের দুই অধ্যায়। একদল মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্নে কারাগারে বন্দি হয়েছেন, আরেকদল মানুষ বিদেশি পণ্য বর্জন করে অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। আলিপুর মিউজিয়ামের সেই ছোট্ট শেডটি তাই নীরবে স্বাধীনতা সংগ্রামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের কথা বলে যায়।

আলিপুর জেলের ২৫টি ওয়ার্ডে প্রায় ২০০০ বন্দি ছিলেন। কারো দশ বছর, কারো পনেরো, কারো বিশ বছরের ঠিকানা ছিল এই কারাগার। জেলের অন্দরে ছাপাখানায় প্রায় দুশ সরকারি কর্মীর সঙ্গে কাজ করতেন ১০০ জন বন্দিও। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সাজাপ্রাপ্তদের দিয়ে চরকায় সুতোর কাজ করানো হতো। তারা যেন কাজে ফাঁকি দিতে না পারেন; সেজন্য সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা বসানো হয়েছিল।
সেন্ট্রাল জেল থেকে বেরিয়ে এলাম। পথের কিছুই চিনছি না। কোথায় যাব সেটাই বুঝছি না। পথ গুলিয়ে ফেলেছি। যতীন দাস পার্ক মেট্রোতে যাব, সেকথা কাউকে বোঝাতে পারছি না। হাজড়া মোড়ের কথাও গুলিয়ে ফেলেছি। এ সময় দেবদূতের মতো হাজির হলেন এক যুবক বন্ধু। আমাকে সঙ্গে নিয়ে হাজড়া মোড়ে নেমে গেলেন। যতীন দাস থেকে গিরিশ পার্ক স্টেশনের টিকিট কেটে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেলেন বন্ধুটি!
চলবে...
আরও পড়ুন
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৬
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৫
কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ৪
এসইউ








