বাইশ বছরের তরুণী রুমা। উচ্চবিত্ত পরিবারের এই আধুনিক মেয়ের কাছে দেশপ্রেম যেন নিতান্তই এক সেকেলে আবেগ। চারপাশের অস্থিরতা, রাস্তা অবরোধ আর রাজনৈতিক ডামাডোলে সে চরম বিরক্ত। তার একমাত্র লক্ষ্য—ভিসা পেলেই এই ‘বসবাসের অযোগ্য’ দেশ ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমানো।
পুরোনো আমলের ধুলোজমা ঘরটায় বসে ট্রলিতে স্যুটকেস গোছাচ্ছিল সে। দূর থেকে ভেসে আসছিল মিছিলের স্লোগান। চরম বিরক্তিতে জানালাটা সজোরে বন্ধ করে বিছানায় এসে বসল রুমা। সামনে রাখা একটি ভারী কাঁসার বাক্স। তার প্রয়াত দাদু, ভাষাসৈনিক আলতাফ হোসেনের স্মৃতিবিজড়িত বাক্স সেটি। দাদু মারা যাওয়ার পর থেকে এই ঘরে এলেই রুমার গা ছমছম করে। কিন্তু আজ বাক্সটি যেন অদ্ভুত এক মায়ায় তাকে ডাকছিল।
হঠাৎ রুমার কানে ভেসে এল এক অশরীরী ফিসফিসানি। যেন দাদু বলছেন, ‘ওতে আমার যৌবন আছে রে মা...ওতে আমার মায়ের কান্না আর ভাইয়ের রক্ত আছে। খুলবি না? বাক্সটা খুলবি না, রুমা?’

বিভ্রম ভেবে প্রথমে উড়িয়ে দিতে চাইলেও অদম্য কৌতূহলে বাক্সটি খুলেই ফেলল সে। ভ্যাপসা গন্ধ ছাপিয়ে বেরিয়ে এল কিছু পুরোনো লিফলেট, যাতে লেখা—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ইংরেজি মাধ্যমে পড়া রুমার কাছে এগুলো নিছকই আবর্জনা। এরপর তার হাতে উঠে এল রক্তমাখা ফিতার একটি ভাঙা হাতঘড়ি। বুকটা ধক করে উঠল তার। সবশেষে মখমলের ছোট্ট একটি পুঁটলি থেকে বেরিয়ে এল অদ্ভুত এক নীলকান্তমণি।
পাথরটি হাতে নেওয়ামাত্রই মনে হলো, যেন জ্বলন্ত অঙ্গার ছুঁয়েছে সে। হাত সরাতে পারল না রুমা। পাথরের গা থেকে বিচ্ছুরিত নীল আলোয় ভেসে উঠল একটি বছর—‘১৯৫২’। চোখের নিমেষে ঘরের দেয়াল গলে গিয়ে চারপাশ অন্ধকারে তলিয়ে গেল। হাজারো মানুষের গর্জনে কান ফেটে যাওয়ার উপক্রম—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই!’ এক প্রবল কালস্রোত নিমেষেই গ্রাস করে নিল রুমাকে।

চেতনা ফিরতেই সে আবিষ্কার করল, দাদুর সেই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে সে আর নেই। প্রখর রোদের নিচে ধূলিমলিন এক রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনের জিনস-টপসের বদলে গায়ে জড়ানো সাধারণ একটি সুতির শাড়ি। বাতাসে বারুদের কড়া গন্ধ, দূরে বাজছে পুলিশের সাইরেন।
পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক যুবক আরেকজনকে বেশ উত্তেজিত গলায় বলছে, ‘মজিদ, খবর পাইছিস? নুরুল আমিন সরকার নাকি ১৪৪ ধারা জারি করছে। মিছিল করলেই গুলি চালাইব!’
অন্যজন পানের পিক ফেলে রাগী গলায় উত্তর দিল, ‘গুলি মারব? মারুক না! মায়ের ভাষায় কথা কওয়ার লাইগা যদি জান দিতে হয়, দিমু। কিন্তু উর্দুরে রাষ্ট্রভাষা মানুম না। চল আমতলায়, গাজীউল হকরা কী কয় শুনি। আজকে একটা ফয়সালা হইবই।’
রুমা ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। আমতলার সেই ঐতিহাসিক প্রাঙ্গণ। শত শত ছাত্রের জটলা। সবার চোখেমুখে অনমনীয় জেদ, যেন বারুদের স্তূপে আগুন লাগার অপেক্ষা। রুমা এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছে। তার হাতে ধরা নীলকান্তমণিটি এখন হৃৎপিণ্ডের মতো দপদপ করছে। হঠাৎ এক তরুণ তার সামনে এসে দাঁড়াল। উষ্কখুষ্ক চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। নাম তার আনিস। আনিস সন্দেহভরা চোখে তাকাল রুমার দিকে।
সে এগিয়ে এসে বলল, ‘কী ব্যাপার বোন, তুমি এখানে কী করো? দেখছ না অবস্থা গরম? যেকোনো সময় পুলিশ অ্যাকশন নিব। যাও, হলের দিকে যাও। এই জায়গা মেয়েমানুষের জন্য নিরাপদ না এখন।’
রুমা ঢোক গিলে বলল, ‘আমি...আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি ভাইয়া। আজ আসলে কী হবে?’
আনিস ম্লান হাসল। সে হাসিতে এক অদ্ভুত বিষাদ আর গর্বের মিশ্রণ। সে বলল, ‘কী আর হইব? হয় ইতিহাস হইব, নয়তো লাশ হইব। ওই শোনো, পুলিশ লাউডস্পিকারে কী কয়।’

লাউডস্পিকারে পুলিশের কর্কশ ঘোষণা আসছে: ‘সমাবেশ বেআইনি। আপনারা এক্ষুনি স্থান ত্যাগ করুন। অন্যথায় আমরা বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হব।’
কিন্তু ছাত্ররা অনড়। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান উঠল—‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! নুরুল আমিনের কল্লা চাই!’
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। টিয়ার গ্যাস! রুমার চোখ জ্বলে উঠল, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। চারদিকে ছোটাছুটি আর চিৎকার।
রুমা দেখল, পুলিশের লাঠিপেটায় ছাত্ররা মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে, তবু কেউ স্লোগান থামাচ্ছে না। ওর চোখের সামনেই একটি ইট কুড়াতে গিয়ে পুলিশের লাঠির আঘাতে লুটিয়ে পড়ল আনিস। মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত ঝরছে। রুমা পাগলের মতো সাহায্য চাইতে লাগল, কিন্তু সেই কোলাহলে কেউ তা শুনল না। আনিস রুমার হাত খামচে ধরে তার শেষ ইচ্ছাটুকু জানাল—মাকে যেন বলে, সে পিঠ দেখিয়ে পালায়নি। তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটি শুধু ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘পানি...এক ফোঁটা পানি...।’
এরপরই আনিসের মাথাটা ঢলে পড়ল।
আনিসের নিস্তেজ শরীরের ওপর নীলকান্তমণিটি রাখতেই সেটি অদ্ভুতভাবে জ্বলে উঠল। মুহুর্মুহু গুলির শব্দের মধ্যে রাজপথ তখন রক্তে ভাসছে। আনিসের সেই তৃষ্ণার্ত আকুতি বুকে নিয়ে রুমা আবারও হারিয়ে গেল সময়ের এক নতুন ঘূর্ণিপাকে।

শিমুল ফুলের লাল দুঃখ

সময়টা ১৮ জুলাই, ২০২৪। সন্ধ্যা নামছে। উত্তরা-আজমপুর থেকে রামপুরা-বাড্ডা লিংক রোড পর্যন্ত বিস্তৃত গোটা এলাকাই যেন এক রণক্ষেত্র। আকাশে হেলিকপ্টারের টহল, মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ আর বুলেটের ঝলকানি।
রাস্তার পাশে সিমেন্টের পিলারের আড়ালে ধুলো আর ছাইমাখা সালোয়ার-কামিজে বসে থরথর করে কাঁপছে রুমা। বায়ান্ন আর চব্বিশের কোলাহল তার মস্তিষ্কে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেদ করে লাঠি হাতে ছুটে এল একদল তরুণ-তরুণী। তাদেরই একজন নবণীতা। এই জেন-জি মেয়েটিকে রুমা চিনত রাজনীতিবিমুখ, আত্মকেন্দ্রিক হিসেবে; কিন্তু আজ তার চোখেমুখে আগ্নেয়গিরির তেজ।
নবণীতা জানাল, ওরা তাদের ভাইদের পাখির মতো গুলি করে মেরেছে। এখন আর পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। হঠাৎ খুব কাছেই একটি টিয়ার শেল এসে পড়ল। শ্বাসকষ্টে কাশতে থাকা রুমার সামনে দেবদূতের মতো শান্ত ভঙ্গিতে এসে দাঁড়াল এক যুবক। মুখে তার মায়াবী হাসি, দুহাতে একরাশ পানির বোতল।
‘চোখ জ্বলছে? এই যে ভিনেগার নিন। পানি লাগবে? পানি?’
যুবকটি রুমার সামনে এসে দাঁড়াল। রুমা স্তব্ধ হয়ে গেল। বায়ান্ন সালের সেই তৃষ্ণার্ত আনিসের মুখের আদল যেন এই ছেলেটির মধ্যে! ছেলেটি নিজের নাম জানাল—মুগ্ধ। রাজপথই এখন তার ঘরবাড়ি। রুমা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। বাহাত্তর বছর আগে একজনকে এক ফোঁটা পানি দিতে না পারার যে হাহাকার সে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে, আজ এই আগুনের ভেতর সেই ছেলেটিই যেন তাকে পানি খাওয়াতে এসেছে!
মুগ্ধ ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতেই বিকট এক গুলির শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। লুটিয়ে পড়ল মুগ্ধ। তার কপালে তাজা রক্ত; কিন্তু ঠোঁটের কোণে সেই মায়াবী হাসিটা তখনো লেগে আছে। রুমার সাদা ওড়না রক্তে লাল হয়ে গেল। আনিসকে বাঁচাতে না পারার আক্ষেপ আর মুগ্ধর এই মর্মান্তিক পরিণতি রুমাকে পুরোপুরি বদলে দিল। তার হাতের সেই নীল পাথরটি এখন জ্বলন্ত কয়লার মতো টকটকে লাল।

সব ভয়কে জয় করে রুমা রুখে দাঁড়াল। জনতার উদ্দেশে সে চিৎকার করে বলল, ‘আর কোনো কান্না নয়! এক ফোঁটা রক্ত থেকে হাজারটা স্ফুলিঙ্গ জন্ম নেবে।’
আনিসের অতৃপ্ত আত্মা আর মুগ্ধর পবিত্র রক্তের শপথ নিয়ে রুমা নিজেই সেদিন ছাত্র-জনতার কাতারে মিশে গেল। সেই স্ফুলিঙ্গই দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে গণভবনের দিকে ধেয়ে গেল এক উত্তাল জনস্রোত।

৫ আগস্ট, ২০২৪। দীর্ঘ এক মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর এল সেই কাঙ্ক্ষিত সকাল। স্বৈরশাসনের পতন হলো। আকাশটা আজ অদ্ভুত নীল। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে বিজয়ের উল্লাসে। রুমা ক্যাম্পাসের ঘাসের ওপর বসে আছে। তার শরীর ক্লান্ত, সারা গায়ে আঘাতের কালশিটে দাগ, কিন্তু মন প্রশান্ত। হাতের নীলকান্তমণিটি এখন আর নীল নেই, সেটি স্বচ্ছ স্ফটিকে পরিণত হয়েছে। এর ভেতরের শক্তি নিঃশেষিত; এটি তার কাজ শেষ করেছে।
রুমা বুঝল, এই পাথর কোনো জাদুর কাঠি নয়—এটি ছিল ইতিহাসের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর সাহসের আধার। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই সাহস হস্তান্তর করাই ছিল এর মূল কাজ।

পড়ন্ত বিকেল। রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে স্নিগ্ধ বাতাস বইছে। চারপাশের দেয়াল ভরে উঠেছে নতুন গ্রাফিতিতে—‘পানি লাগবে পানি?’, ‘দেশটা কারও বাপের না’। বেদিতে বসে আছে রুমা আর নবণীতা।
নবণীতা আবেগঘন কণ্ঠে বলল, ‘আপু, আমরা পেরেছি! বিশ্বাস হচ্ছে না, আমরা স্বাধীন!’
রুমা হাসল। সে স্ফটিকটি হাতে নিয়ে আকাশের দিকে তাকাল। আনিস, মুগ্ধ, আবু সাঈদ—সবার মুখগুলো ভেসে উঠল মেঘের ভেলায়। তারা যেন ওপর থেকে তাকিয়ে হাসছে।
রুমা নবণীতার হাত ধরে বলল, ‘হ্যাঁ, পেরেছ। কিন্তু মনে রেখো বোন, স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর যাত্রা। ৫২-তে আমরা ভাষা পেয়েছি, ২৪-এ পেলাম বৈষম্যহীনতার স্বপ্ন।’
রুমা তার পকেট থেকে পাসপোর্ট আর কানাডার টিকিটটা বের করল। তারপর ধীরে ধীরে টিকিটটা ছিঁড়ে বাতাসে উড়িয়ে দিল।
অবাক নবণীতাকে সে বলল, ‘যে দেশের ছেলেমেয়েরা বুলেটের সামনে বুক পেতে দেয়, সেই দেশ ছেড়ে আমি কোনো তথাকথিত নিরাপদ জীবনে যাব না। আমি আমার শিকড় খুঁজে পেয়েছি। মুগ্ধরা রক্ত দিয়ে যে দেশ নতুন করে স্বাধীন করেছে, তাকে বৈষম্যহীন করে গড়ার দায়িত্ব এখন আমাদেরই। আমাদের লড়াই থামবে না কখনো। সময়ের প্রতিটি বাঁকে যখনই অন্যায় হবে, তখনই আবার জেগে উঠবে ৫২, আবারও ফিরে আসবে ২৪।’

শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ, শান্তিনগর, ঢাকা