গোলাম কবীর, টরন্টো
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার স্বপ্নবাজ তরুণ-তরুণী উন্নত জীবনের আশায় কানাডায় পাড়ি জমানোর স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর এক নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় অনেককেই। মাসের পর মাস কাটে কাঙ্ক্ষিত একটি কাজের খোঁজে।
অনেকেই যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক দিকনির্দেশনা এবং বাস্তবমুখী দক্ষতার অভাবে শুরুতে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়ান। অথচ একটু সচেতন হলে এবং দেশ ছাড়ার আগে সঠিক প্রস্তুতি নিলে এই দৃশ্যরুপ পুরোপুরি বদলে ফেলা সম্ভব। পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে, কাজের জন্য আপনাকে নয়, বরং কাজই আপনাকে খুঁজে নেবে!
বর্তমানে কানাডার শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট- এখানে শুধু পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে দক্ষ কারিগর বা প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি কর্মীদের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী। কানাডা সরকারও তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এই খাতের পেশাজীবীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাই কানাডা যাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
বিশেষ করে, নিচের সাতটি কারিগরি কাজের যে কোনো দুটিতে যদি পর্যাপ্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং কোনো সরকারি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান থেকে যোগ্যতা সনদ অর্জন করা যায়, তবে কানাডায় কর্মসংস্থানের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে যায়।
মোটরযান মেরামত: উন্নত দেশগুলোতে গাড়ি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও চাহিদাসম্পন্ন একটি কাজ।
বৈদ্যুতিক কাজ: গৃহস্থালি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক-সবখানেই দক্ষ বিদ্যুৎকর্মীর অভাব রয়েছে।
পাইপলাইনের কাজ: স্যানিটারি ও পাইপলাইনের কাজ জানা থাকলে কাজের অভাব হয় না।
বাড়ি সংস্কার (নির্মাণ ও মেরামত): কানাডায় ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের বাজারটি বিশাল এবং অত্যন্ত লাভজনক।
গৃহস্থালি ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র মেরামত: ফ্রিজ, ওভেন, ওয়াশার, ড্রায়ার কিংবা এয়ার কন্ডিশন সচল করার কাজ জানা লোকেদের চাহিদা বারোমাস।
মুঠোফোন ও ল্যাপটপ মেকানিক: আধুনিক যুগের চিপ-লেভেল বা যন্ত্রাংশ মেরামতের কাজে দক্ষদের জন্য রয়েছে দারুণ সুযোগ।
প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এই সাধারণ কাজগুলো একজন উচ্চশিক্ষিত তরুণকে এগিয়ে রাখবে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে কানাডার জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর। উন্নত এই দেশটিতে যে কোনো কারিগরি কাজের মজুরি অনেক বেশি। ফলে সাধারণ নাগরিকরা সব কাজ নিজেরা করতে পারেন না এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি সবসময়ই থেকে যায়।
আরও পড়ুন
প্রবাসীর সবচেয়ে বড় কষ্ট: প্রিয়জনকে শেষবারের মতো না দেখা
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এই কাজগুলো ভালোভাবে জানা থাকলে এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে পারলে কানাডার কেন্দ্রীয় দক্ষ কারিগর কর্মসূচির অধীনে অত্যন্ত সহজে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া যায়।
তবে কেবল কাজের দক্ষতা থাকলেই চলবে না, এর সাথে বাড়তি তিনটি যোগ্যতা অর্জন করা এখন বাধ্যতামূলক শর্তের মতোই দাঁড়িয়েছে।
প্রথমত, বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা। শুধু যোগ্যতা সনদ পকেটে নিয়ে বিমানে উঠলে চলবে না। দেশ ছাড়ার আগে সংশ্লিষ্ট কাজে অন্তত ছয় মাসের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে এবং নিয়োগকর্তার কাছ থেকে প্রামাণ্য অভিজ্ঞতাপত্র সংগ্রহে রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইংরেজি ভাষার ওপর দখল। কারিগরি কাজে দক্ষ হলেও যোগাযোগের ভাষা যদি দুর্বল হয়, তবে নিয়োগের সাক্ষাৎকার পার হওয়া অসম্ভব। তাই ইংরেজিতে দারুণ সাবলীল হওয়া চাই। পাশাপাশি সেখানে স্থায়ী বসবাসের আবেদনের যোগ্যতার জন্য আন্তর্জাতিক ইংরেজি ভাষা পরীক্ষা পদ্ধতিতে একটি ভালো স্কোর তোলার প্রস্তুতি আগে থেকেই নিতে হবে।
তৃতীয়ত এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, যানবাহন চালনার অনুমতিপত্র। কানাডায় এই ধরনের কাজের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি বা সরঞ্জাম নিয়ে নিয়মিত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতে হয়।
সেখানে গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য গাড়ি চালনা জানা এবং এর বৈধ অনুমতিপত্র থাকাটা আপনার কাজের পরিধি ও আয়ের সুযোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
অন্ধের মতো শুধু সুযোগের পেছনে না ছুটে, কৌশলগতভাবে নিজেকে প্রস্তুত করাই সফলতার মূল চাবিকাঠি। কানাডা সরকার যখন দক্ষ পেশাজীবীদের দুহাত বাড়িয়ে ডাকছে, তখন আমাদের তরুণদের উচিত অযথা সময় নষ্ট না করে এই সুযোগ লুফে নেওয়া। সঠিক কৌশল, বাস্তবমুখী দক্ষতা এবং দূরদর্শিতাকে পুঁজি করে আজই শুরু হোক আপনার কানাডা জয়ের প্রস্তুতি।
এমআরএম








