মিজানুর রহমান, জার্মানি

বাইরে থেকে দেখলে ইউরোপ মানেই এক চমৎকার হাতছানি। আমরা দূর থেকে শুধু ইউরোর ঝনঝনানি, নিয়মতান্ত্রিক জীবন আর জার্মানির ঝকঝকে চওড়া রাস্তাগুলোই দেখি।

ভাবি, ওখানে পৌঁছাতে পারলেই হয়তো জীবনের সব না-পাওয়া এক নিমেষে মুছে যাবে। কিন্তু এই ঝলমলে বাস্তবতার ঠিক পেছনেই লুকিয়ে থাকে এমন কিছু অন্ধকার আর নির্মম সত্য, যা শুনলে হয়তো যে কোনো মানুষ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাবেন। এই আড়ালে থাকা গল্পগুলো প্রবাসীরা সহজে দেশের মানুষের সামনে আনেন না, হয়তো বুক ফাটলেও মুখ ফুটে বলতে পারেন না।

প্রথম ধাক্কাটা আসে আত্মসম্মানে। দেশে আপনি কত বড় অফিসার ছিলেন, আপনার পারিবারিক বা সামাজিক মর্যাদা কী ছিল, কিংবা আপনি কত বড় ডিগ্রিধারী- জার্মানির মাটিতে পা রাখার পর শুরুতে তার কোনো মূল্য নেই।

একজন নতুন শিক্ষার্থী বা অভিবাসী হিসেবে এখানে এসে অনেককেই রেস্টুরেন্টে থালাবাসন ধুতে হয়, সুপারশপে পণ্য গোছাতে হয় কিংবা ক্লিনিং-এর কাজ করতে হয়। নিজের এতদিনের চেনা পরিচয় আর অহংকারকে পকেটে পুরে রেখে, একদম ‘জিরো’ থেকে জীবন শুরু করার এই মানসিক কষ্টটা সহ্য করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

বিদেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় যাতনার নাম ‘সোশ্যাল আইসোলেশন’ বা চরম একাকীত্ব। এখানে আপনি যদি তীব্র জ্বরে বিছানায় পড়ে থাকেন, তবে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেওয়ার মতো কেউ পাশে থাকবে না। বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিচিত মানুষ-সবাই নিজের কাজ, পড়াশোনা আর যান্ত্রিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে এতটাই ব্যস্ত যে, মাসের পর মাস কারো সাথে মন খুলে দুটো কথা বলার ফুসরত মেলে না।

দেশে বসে অনেকেই হয়তো এই একাকীত্বের কষ্টটা শুনে হাসবেন, কিন্তু চার দেয়ালের ভেতরের এই নিস্তব্ধতা যে কতটা ভয়ংকর, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।

আপনি যতই ভালো জার্মান ভাষা শিখুন না কেন, কিংবা যতই নিখুঁতভাবে এখানকার নিয়মকানুন মেনে চলুন-সমাজের একটি বড় অংশের কাছে আপনি সারাজীবন একজন ‘বিদেশি’ হয়েই থাকবেন। কর্মক্ষেত্রে বা দৈনন্দিন জীবনের নানা বাঁকে মাঝে মাঝে এমন কিছু সূক্ষ্ম বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হবে, যা আপনার মনকে বিষিয়ে তুলবে। এই অদৃশ্য দেয়াল আর বৈষম্যকে মেনে নিয়েই আপনাকে প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

আরও পড়ুন

কানাডার মাটিতে পা রেখেই কর্মসংস্থান: স্বপ্ন নয়, বাস্তব কৌশল

তবে প্রবাস জীবনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং বুকভাঙা সত্যিটি ঘটে তখন, যখন আপনি এখানে নিজের ক্যারিয়ার বা ভবিষ্যৎ গড়ার কঠিন যুদ্ধে ব্যস্ত, আর ঠিক তখনই খবর আসে- দেশে আপনার সবচেয়ে প্রিয় কোনো মানুষ আর নেই।

ইচ্ছা থাকলেও অনেক সময় ভিসা জটিলতা, আইনি কাগজপত্রের সমস্যা কিংবা জরুরি ফ্লাইটের টিকিটের অভাবের কারণে শেষবারের মতো প্রিয়জনের মুখটা দেখার সুযোগ হয় না। শেষ বিদায় জানাতে না পারার এই চিরস্থায়ী অপরাধবোধ একজন প্রবাসীকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়, যা কোনো ইউরো দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

এই বাস্তব চিত্রগুলো তুলে ধরার উদ্দেশ্য কাউকে ভয় দেখানো নয়, বরং বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানসিকভাবে শক্ত করা। জার্মানি বা ইউরোপের মাটি আপনাকে হয়তো ক্যারিয়ার ও আর্থিক সাফল্য দুহাত ভরে দেবে, কিন্তু তার বিনিময়ে আপনার ভেতরের আবেগ, উৎসবের আনন্দ আর পরিবারের সাথে কাটানোর সোনালী সময়কে কেড়ে নেবে।

সাফল্যের পেছনের এই অন্ধকার দিকগুলো এবং ত্যাগগুলো মেনে নেওয়ার মানসিক শক্তি থাকলেই কেবল জার্মানির স্বপ্ন দেখা মানায়।

এমআরএম