৭ জুলাই ২০২৬। কানাডার টরন্টো শহরের ড্যানফোর্থ এভিনিউ এবং স্কারবরো এলাকা ভ্রমণ করতে গিয়ে এমন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম, যা বিদেশ ভ্রমণের প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল। বিদেশে গিয়ে নিজের দেশের গন্ধ পাওয়ার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। পৃথিবীর বহু দেশে বাংলাদেশিদের বসতি আছে। কোথাও তারা কঠোর পরিশ্রম দিয়ে নিজেদের পরিচিতি গড়েছেন, কোথাও ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন, আবার কোথাও শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, মিশিগান, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া, ভার্জিনিয়া, জর্জিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, টেনেসি এবং কেন্টাকিসহ বহু অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশিদের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কোথাও বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ, কোথাও মুদি দোকান, কোথাও মসজিদ কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। কিন্তু টরন্টোর ড্যানফোর্থ এভিনিউ এবং স্কারবরো ঘুরে আমার মনে হলো, আমি যেন বিদেশে নই, বাংলাদেশেরই কোনো পরিচিত শহরের রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছি। এত বিস্তৃত, এত ঘন এবং এত স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশকে ধারণ করে থাকা একটি জনপদ আমি আগে কোথাও দেখিনি। ড্যানফোর্থ যেন সত্যিই বাংলাদেশের একটি সম্প্রসারিত সংস্করণ।

toronto

সকালের আলোয় ড্যানফোর্থ এভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে প্রথম যে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করল, তা হলো বাংলা ভাষার অবাধ উপস্থিতি। রাস্তার দুপাশে অসংখ্য দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। কোথাও ঢাকা সুইটস, কোথাও বাংলা বাজার, কোথাও দেশি মাছ ঘর, কোথাও সিলেট গ্রোসারি, আবার কোথাও মদিনা হালাল মিট। অনেক দোকানে ইংরেজির তুলনায় বাংলাই বেশি চোখে পড়ে। পথচারীদের কথোপকথনে ভেসে আসে ঢাকার, সিলেটের, নোয়াখালীর কিংবা চট্টগ্রামের পরিচিত উচ্চারণ। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম, এটি শুধু ভাষার উপস্থিতি নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ। মুদি দোকানে বাংলাদেশের চাল, ডাল, সরিষার তেল, মুড়ি, চিড়া, আচার, মসলা থেকে শুরু করে তাজা পান, সুপারি এবং জর্দা পর্যন্ত পাওয়া যায়। মাছের বাজারে বরফের ওপর সাজানো ইলিশ, রুই, কাতলা, বোয়াল, পাবদা, শিং, মাগুর, চিংড়ি, চ্যাংরা, আইড় দেখে মনে হচ্ছিল; যেন বাংলাদেশের কোনো ঐতিহ্যবাহী বাজারে দাঁড়িয়ে আছি। সবজির দোকানে লাউ, কুমড়া, পুঁইশাক, লালশাক, ডাঁটা, কচুশাক, করলা, পটল ও ঢ্যাঁড়শের সমারোহ সেই অনুভূতিকে আরও গভীর করে তুলেছিল।

আরও পড়ুন

নায়াগ্রার গর্জন পেরিয়ে টরন্টোর পথে

বিস্ময় নিয়ে কয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বললাম। তারা জানালেন, এসব পণ্যের একটি বড় অংশ নিয়মিত বাংলাদেশ থেকে কিংবা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন আমদানিকারকের মাধ্যমে আসে। বিশ্বায়নের যুগে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর চাহিদা একটি শক্তিশালী বাজার তৈরি করেছে। আজ কানাডার বাজারে বাংলাদেশি কৃষিপণ্য, মসলা, হিমায়িত মাছ এবং বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের একটি সুসংগঠিত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তবে ড্যানফোর্থকে শুধু একটি বাজার বললে ভুল হবে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কেন্দ্র। এখানে বাংলাদেশি মালিকানাধীন আইনজীবীর কার্যালয়, হিসাবরক্ষকের অফিস, চিকিৎসক ও দন্তচিকিৎসকের চেম্বার, রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান, ট্রাভেল এজেন্সি, মানি ট্রান্সফার সেবা এবং বীমা প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত উপস্থিতি আছে। এমনকি বহু বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াও বাংলাদেশি। ফলে নতুন কেউ কানাডায় এলে ইংরেজি ভাষায় খুব বেশি দক্ষ না হয়েও দীর্ঘদিন নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং পরিচিত পরিবেশের মধ্যেই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

toronto

এই এলাকায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। একাধিক মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার, হিন্দু মন্দির এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনকে ঘিরে একটি প্রাণবন্ত সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে। রমজানে ইফতার, ঈদের জামাত, দুর্গাপূজা, পয়লা বৈশাখ, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়ে, বাংলা গান বাজে, কবিতা আবৃত্তি হয়, নাটক মঞ্চস্থ হয়। মনে হয়, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও সাংস্কৃতিক দূরত্ব যেন নেই। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে অনুপস্থিত নয়। বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থকদের বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আছে। নির্বাচনের সময় আলোচনা, মতবিনিময় এবং রাজনৈতিক বিতর্কও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিদেশে থেকেও মানুষ যে নিজের দেশের রাজনীতি, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সমানভাবে ভাবতে পারেন, ড্যানফোর্থ তার একটি বাস্তব উদাহরণ।

পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকে কানাডায় বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কানাডায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা দুই লক্ষাধিক এবং তাদের একটি বড় অংশ বৃহত্তর টরন্টো অঞ্চলে বসবাস করেন। ড্যানফোর্থ, স্কারবরো, ইস্ট ইয়র্ক, ভিক্টোরিয়া পার্ক, থর্নক্লিফ পার্ক এবং আশপাশের এলাকাগুলো বাংলাদেশি বসতির জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রতি বছর পরিবার পুনর্মিলন, দক্ষ অভিবাসন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং স্থায়ী বসবাসের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন নতুন বাংলাদেশি কানাডায় যোগ দিচ্ছেন। ফলে এই সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

toronto

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের টুকরো গল্প

২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, কানাডার মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশই অভিবাসী, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ অনুপাতগুলোর একটি। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠী বর্তমানে কানাডার বৃহত্তম দৃশ্যমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, যার সদস্যসংখ্যা ২৫ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি। এই অনুকূল অভিবাসন পরিবেশ বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের বিকাশকেও উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করেছে। কানাডার বহু সাংস্কৃতিক নীতিও এই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি নীতি অনুসরণ করে আসছে, যেখানে অভিবাসীদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশকে উৎসাহিত করা হয়। ফলে বাংলাদেশিরা শুধু নিজেদের পরিচয় ধরে রাখতেই সক্ষম হননি বরং সেই পরিচয়কে উদ্যোক্তা সাফল্য, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, পেশাগত দক্ষতা এবং সামাজিক নেতৃত্বের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তিতেও রূপান্তর করেছেন। আজ টরন্টোর বহু বাংলাদেশি পরিচালিত ব্যবসা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে এবং নতুন অভিবাসীদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করছে। বাংলা ভাষার সাইনবোর্ড, বাংলাদেশি উৎসব, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং দেশীয় খাদ্যপণ্যের সমৃদ্ধ বাজার তাই শুধু আবেগের প্রকাশ নয় বরং কানাডার বহু সাংস্কৃতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, সফল অভিবাসী অন্তর্ভুক্তি এবং বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ড্যানফোর্থ ও স্কারবরোর আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি। নতুন অভিবাসী এলে বাসা খুঁজে দেওয়া, চাকরির তথ্য দেওয়া, স্কুলে ভর্তি, ব্যাংক হিসাব খোলা কিংবা সরকারি সেবা সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা একে অন্যের পাশে দাঁড়ান। এই সহযোগিতামূলক পরিবেশ নতুনদের জন্য নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি তৈরি করে। তবে এই বাস্তবতার আরেকটি দিকও আছে। যখন একটি অভিবাসী সম্প্রদায় অত্যন্ত ঘনভাবে নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে; তখন মূলধারার সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ কিছুটা সীমিত হয়ে যেতে পারে। ভাষা শিক্ষা, বহু সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং পেশাগত বিস্তারের ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। তাই নতুন প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশি পরিবার সচেতনভাবে সন্তানদের একই সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির শেকড় এবং কানাডীয় নাগরিক পরিচয়ের মূল্যবোধে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছেন। এই ভারসাম্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

toronto

দিনের শেষে ড্যানফোর্থ এভিনিউ এবং স্কারবরো ছেড়ে ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, আমি কানাডা ভ্রমণ করলাম ঠিকই, কিন্তু কয়েক ঘণ্টার জন্য যেন বাংলাদেশেরই আরেকটি শহরে বসবাস করে এলাম। বিদেশের আকাশের নিচে, ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়েও বাংলা ভাষার হাসি, দেশি মাছের গন্ধ, চায়ের কাপে প্রাণখোলা আড্ডা, ঈদের প্রস্তুতি, বৈশাখের গান এবং মানুষের আন্তরিক মুখগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল, দেশ কেবল একটি মানচিত্রের নাম নয়। দেশ হলো মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি, ভাষা, সম্পর্ক এবং সম্মিলিত অস্তিত্বের আরেক নাম। ড্যানফোর্থে হাঁটতে হাঁটতে আমার বারবার মনে হয়েছে, একটি জাতি শুধু নিজের ভূখণ্ডেই বেঁচে থাকে না, মানুষের হৃদয়, স্মৃতি এবং সংস্কৃতির মধ্য দিয়েও পৃথিবীর নানা প্রান্তে নতুন করে জন্ম নেয়। সেদিন ড্যানফোর্থ ছেড়ে ফিরলেও মনে একটি প্রশ্ন দীর্ঘক্ষণ রয়ে গেল। আমরা কি সত্যিই কানাডায় ছিলাম, নাকি কয়েক ঘণ্টার জন্য বাংলাদেশেরই একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছিলাম।

এসইউ